ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন কৌশল ব্যর্থ করে দিচ্ছে চীন-রাশিয়া?

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ জোরদার করে দেশটির ওপর চূড়ান্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরির লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি “ইকোনমিক ডি-ডে” ঘোষণা করেছে। তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার এই মার্কিন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বেইজিং ও মস্কোর সাথে ইরানের গড়ে ওঠা গভীর টেকসই বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নকরণ নীতি সফল করা বেশ কঠিন হবে, কারণ চীন ও রাশিয়া ইতিমধ্যেই এমন একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের আওতার বাইরে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির মূলে রয়েছে ইরানকে যেকোনো ধরণের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদানকারী দেশকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে এই মার্কিন হুমকি প্রায় নিষ্ফল বললেই চলে। রাশিয়া নিজেই দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন ও পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি। এর ফলে মস্কো মার্কিন আর্থিক কাঠামোর সীমানার বাইরে গিয়ে একটি বিকল্প বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার জন্য ইরানের সাথে বাণিজ্য বা সামরিক-কৌশলগত লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের বাধা তৈরি করতে পারছে না।

অন্যদিকে, ইরানের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার চীনও মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করার সামর্থ্য রাখে। ইরানের মোট রপ্তানিকৃত খনিজ তেলের সিংহভাগই কিনে থাকে চীন। বেইজিং ইরানের তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এমন সব স্বাধীন তেল শোধনাগার ব্যবহার করে, যেগুলোর সাথে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বা ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের কোনো সংযোগ নেই। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের প্রধান ব্যাংকগুলোর ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, মার্কিন-চীন অর্থনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে যদি বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক সত্তাগুলোর ওপর সরাসরি আক্রমণাত্মক সেকেন্ডারি স্যাংশন চাপানো হয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও দু’দেশের বাণিজ্য সম্পর্কের চরম ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই নীতিতে একটি বড় ফাঁক রয়েছে; তিনি বহু পাক্ষিক জোটের পরিবর্তে একতরফাভাবে এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করতে চাচ্ছেন। অতীতে ইরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর একটি সমন্বিত যৌথ প্রয়াস কাজ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে গেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নতুন করে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা কিংবা হুমকি আরোপ কখনো কোনো সংকটের স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলোচনার পথেই এর সমাধান খোঁজা উচিত।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান ও তাদের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণার উদ্যোগ সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীনের তৈরি করা বিকল্প বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক সুরক্ষাবলয় মার্কিন কৌশলকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। বেইজিং ও মস্কোর মতো পরাশক্তিগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি ট্রাম্পের ইরান নীতি বাস্তবায়নের পথকে অত্যন্ত জটিল ও সংকুচিত করে তুলছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights