ইরানের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ভাঙতে স্টারলিংক কোনো কাজে আসছে কি?
অনলাইন ডেস্ক
ইরানে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ডিজিটাল অন্ধকার কাটিয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংক। দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রশাসনের নজিরবিহীন কঠোর অবস্থানের মুখে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে স্টারলিংক এখন অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সম্প্রতি খবর পাওয়া গেছে, স্টারলিংক কর্তৃপক্ষ ইরানি ব্যবহারকারীদের জন্য তাদের পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে দিয়েছে। যদিও স্পেসএক্স বা ইলন মাস্কের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা এখনো আসেনি।
তবে ব্লুমবার্গ ও এপিসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো অ্যাক্টিভিস্ট ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে নিশ্চিত করেছে, ইরানে বর্তমানে কোনো সাবস্ক্রিপশন ফি ছাড়াই স্টারলিংক ব্যবহার করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে মাস্কের সঙ্গে আলোচনার আহ্বানের পর এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের গুরুত্ব অপরিসীম। গত ৮ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে, যা এর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। বিক্ষোভের খবর ও ভিডিও যাতে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য ইরান সরকার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে সেলুলার ডেটা এবং এমনকি ল্যান্ডলাইন পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এই ডিজিটাল প্রাচীর ভেদ করতে ইরানিরা মূলত অবৈধভাবে দেশে ঢোকানো স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর ওপর নির্ভর করছে। অনুমান করা হয়, বর্তমানে ইরানে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ স্টারলিংক রিসিভার বা টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে। এগুলো মূলত ২০২২ সাল থেকে চোরাপথে দেশটিতে প্রবেশ করেছে। এখন এই ক্রান্তিকালে সেগুলোই বিক্ষোভের দৃশ্য বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টরা জানাচ্ছেন, তেহরানের কাছে ফরেনসিক মেডিকেল সেন্টারে শত শত মরদেহের যে শিউরে ওঠা ভিডিওটি সারা বিশ্ব দেখেছে, সেটি এই স্টারলিংকের মাধ্যমেই বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে ইরান সরকারও হাত গুটিয়ে বসে নেই। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী স্টারলিংক সিগন্যাল জ্যাম করার জন্য সামরিক গ্রেডের জ্যামার ব্যবহার শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে স্টারলিংকের ডেটা প্যাকেট আদান-প্রদানে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিঘ্ন ঘটছে। এমনকি ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন আকাশপথে ড্রোন উড়িয়ে আবাসিক এলাকার ছাদগুলোতে স্টারলিংকের অ্যান্টেনা বা ডিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই ডিশগুলো ব্যবহার করা ইরানে দণ্ডনীয় অপরাধ।
নতুন এক আইনে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করা ইসরায়েল বা পশ্চিমাদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করার সমান। যার শাস্তি হিসেবে ১০ বছরের জেল থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করা বেশ কিছু স্টারলিংক যন্ত্রপাতির ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। যেগুলোকে নাশকতামূলক উপকরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্টারলিংক মূলত হাজার হাজার ছোট স্যাটেলাইটের একটি সমষ্টি। যা পৃথিবী থেকে মাত্র ৫৫০ কিলোমিটার ওপরে নিম্ন কক্ষপথে অবস্থান করে। সাধারণ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের তুলনায় এটি অনেক দ্রুত এবং এর সিগন্যাল পাওয়া সহজ। ব্যবহারকারীকে কেবল একটি ছোট অ্যান্টেনা বা টার্মিনাল খোলা আকাশে স্থাপন করতে হয়। যেহেতু স্টারলিংক কোনো স্থানীয় টেলিকম অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, তাই সরকার চাইলেও একটি নির্দিষ্ট বোতাম চেপে এটি বন্ধ করতে পারে না। তবে এই প্রযুক্তির দুর্বলতা হলো এর ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল সিগন্যাল রিসিভিং সিস্টেম, যা জ্যামিংয়ের প্রতি বেশ সংবেদনশীল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্পেসএক্স গত ১৩ জানুয়ারি একটি বিশেষ সফটওয়্যার আপডেট দিয়েছে, যা জ্যামিং কাটিয়ে সিগন্যাল স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।
ইরানে স্টারলিংকের এই ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আইনি বিতর্কও কম নয়। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বা আইটিইউ আগেই ইরানের পক্ষে রায় দিয়েছিল। তারা বলেছে, কোনো দেশের অনুমোদন ছাড়া সেখানে স্যাটেলাইট পরিষেবা প্রদান করা অবৈধ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রশাসন এবং স্পেসএক্স সেই নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই ‘মানবিক’ কারণে ইন্টারনেট সচল রাখার পক্ষ নিয়েছে। একদিকে সরকারের দমন-পীড়ন এবং ডিজিটাল সেন্সরশিপ, অন্যদিকে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার এই যে সংঘাত, তা ইরানের বর্তমান সংকটকে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
বিক্ষোভের কারণে ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তি থাকলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে স্টারলিংক কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিকল্প নয় বরং ইরানিদের জন্য বাকস্বাধীনতা রক্ষার শেষ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
যদিও জ্যামিং এবং টার্মিনাল জব্দের ভয়ে ব্যবহারকারীরা আতঙ্কে আছেন, তবুও আকাশচুম্বী ঝুঁকির মধ্যে এই অদৃশ্য নেটওয়ার্কই এখন ইরানের জনপদ থেকে যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠা রাজপথের খবর দুনিয়াকে জানাচ্ছে।
যদিও সমালোচকরা মনে করছেন, স্টারলিংক আসলে প্রযুক্তির অপব্যহার করছে। ইরানে চলমান দমনপীড়ন যেমন কাম্য নয়। তেমন ইরানের বিষয়ে মার্কিন আগ্রাসী হস্তক্ষেপও অগ্রহণযোগ্য।
সূত্র: আল জাজিরা
