ইরানের দিকেই ঝুঁকছে লাভের পাল্লা?

অনলাইন ডেস্ক

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার জন্য একটি চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি কার্যকর হলে তা তেহরানের বড় ধরনের ছাড় পাবে বলে মনে করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবে সায় দেবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র এবং দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা।

ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ অবসানে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তি আসন্ন। অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তারা শুরু থেকেই বলে আসছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহন রুটে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ তারা কখনোই মেনে নেবেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইরানকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তেহরানের অনুকূলে চলে যাবে। যুদ্ধের আগে এই প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং এর জন্য কোনো ফি দিতে হতো না।

বর্তমানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরান ও ওমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশই তাদের নিজস্ব উত্তর ও দক্ষিণ চ্যানেল দিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে। ইরান জানিয়েছে, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং আসা ও যাওয়া উভয় পথের জাহাজই ইরানি জলসীমা অতিক্রম করবে।

এদিকে, তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানি ভূখণ্ডে নতুন করে কোনো মার্কিন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোগুলোতে পাল্টা আঘাত হানা হবে। পাঁচটি সূত্র এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা জানান, ইরানের বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট; যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে পাল্টা হামলা চালাবে।

এরই মধ্যে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তেহরানের অনুমতি ছাড়া আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বাঁধা দিচ্ছে। তবে লাস ভেগাসে সমর্থকদের এক সমাবেশে ট্রাম্প কূটনীতির প্রতি নিজের পছন্দের কথা জানান। তিনি বলেন, তিনি চুক্তি করতেই বেশি আগ্রহী, কারণ তিনি মানুষ হত্যা করতে চান না।

ইরানের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদের তিন হাজার চারশর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ১৮ জন মার্কিন সামরিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

তবে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আঞ্চলিক ও ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। চুক্তি এখনই চূড়ান্ত হয়ে গেছে, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছে তারা।

একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, হরমুজের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আগেই মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে আরেকটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি ঠিক কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে তা এখনো তা নির্দিষ্ট হয়নি। উপসাগরীয় মধ্যস্থতাকারীরা চান আঞ্চলিক দেশগুলো যেন জাহাজ পরিদর্শন তদারকি করে এবং যেকোনো ফি প্রদান যেন স্বেচ্ছাধীন থাকে।

জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার মতে, তাদের দেশ এই প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের পণ্যের মূল্যের উপর ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি দাবি করছে। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু ওয়াশিংটন কোনো ফি দেওয়ারই বিপক্ষে। তিনি আরও জানান, খসড়া চুক্তিতে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ আছে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজগুলোর ওপর তেহরানের কী ভূমিকা থাকবে, তা নিয়ে মূল মতবিরোধ রয়ে গেছে।

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো আসা এবং যাওয়ার উভয় পথেই ইরানের আঞ্চলিক পানিসীমা অতিক্রম করবে, এমনভাবেই কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ওমানের সঙ্গে আলোচনা মৌলিক সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং এই অগ্রগতি চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

গারিবাবাদি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার বিষয়ে গত জুন মাসের মাঝামাঝি সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরে আসতে প্রস্তুত রয়েছে বলে বার্তা পাঠিয়েছে। প্রণালি খুলে দেওয়ার এটি একটি প্রধান শর্ত হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায় ট্রাম্পের ওপর সংকট সমাধানের তীব্র চাপ রয়েছে। জুলাই মাসে দুই সপ্তাহের ব্যাপক হামলা চালিয়েও প্রণালিতে ইরানের ওপর প্রভাব কমানো যায়নি। তাছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীর দূরপাল্লার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হয়ে এসেছে বলে সামরিক কমান্ডাররা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন।

ট্রাম্প ইরান সংঘাত অবসানের আলোচনার কথা উল্লেখ করে নতুন হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়ার পর গত দুই দিনে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights