ইরানের পরমাণু অস্ত্র ঠেকাতে ট্রাম্পের বড় বার্তা, জ্বালানির ‘বাড়তি দামও মানতে রাজি’

অনলাইন ডেস্ক

ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে হলে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা মেনে নেওয়া যায় বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানকে ‘ভীষণ শয়তান’ বলে আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া থেকে ঠেকানোই চলমান সংঘাতের অন্যতম উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানবিরোধী সংঘাত এখনো থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শান্তি আলোচনা এগোয়নি। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। ইরান ‘পরাজয়ের বাস্তবতা’ মেনে না নেওয়া পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়লেও জনগণকে তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে তিনি বলেন, একটি ‘ভীষণ শয়তান’ দেশ যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে গ্যাসোলিনের জন্য সামান্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করা মেনে নেওয়া যায়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবেও তিনি বিষয়টিকে তুলে ধরেন।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলার। এক বছর আগের তুলনায় এই দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি দেশটির মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প জ্বালানি ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেস নির্বাচনের আগে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে ডেমোক্র্যাটরা।

বাড়ছে তেলের দাম
শুক্রবার অপরিশোধিত তেলের ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ ডলার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক সপ্তাহে ৬ শতাংশ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে গারিবাবাদি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, বিমানবাহী রণতরি পাঠানো, সরকারি আদেশ জারি কিংবা নির্বাচনি মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়।

তবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ইরানের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, ইরানের বন্দর অবরোধ এবং তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাই বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রধান কারণ।

আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প ও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, আগামী সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে তেহরান ‘অবরোধ’ হিসেবে বর্ণনা করছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও ইরানি জাহাজগুলোকে বন্দর ছাড়তে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান।

ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই কল্যাণকর এবং তারা এতে ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দুটি জাহাজ অতিক্রম করেছে। এগুলোর কোনোটিতেই অপরিশোধিত তেলের চালান দেখা যায়নি। কিছু জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে গোপনে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেলেও, এ সংখ্যা যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে হরমুজ দিয়ে চলাচল করা ১৩০টির বেশি জাহাজের তুলনায় খুবই কম।

এদিকে জুনে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য একটি চুক্তির যে আভাস পাওয়া গিয়েছিল, সেটিও এখন কার্যত ভেস্তে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি বলেছেন, এমন কোনো যুদ্ধবিরতি ছিল না যার মেয়াদ বাড়ানোর প্রশ্ন উঠতে পারে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের সম্পূর্ণ সমাপ্তি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সূত্র : রয়টার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights