ইরানের সাথে জিততে গিয়ে চীনের সাথে হারের পথে যুক্তরাষ্ট্র?

অনলাইন ডেস্ক
ইরানের মাটিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত ১৫ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে সফল হামলার দাবি করেছে ওয়াশিংটন। যদিও হোয়াইট হাউজ এই আক্রমণকে বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছে, তবে সমর বিশেষজ্ঞরা একে আমেরিকার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ফাঁদ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডিটর ব্র্যান্ডন ওয়েইচার্ট মনে করেন, ইরানকে লক্ষ্য করে চালানো এই ব্যাপক হামলা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাবকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মার্কিন সামরিক শক্তির এই অতি-ব্যবহারকে বেইজিং তাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। ওয়াশিংটন যখন তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাতের নেশায় মত্ত, তখন চীন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমেরিকার সমর কৌশল ও তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। হরমুজ প্রণালীর চলমান অবরোধ এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর পিছু হটা চীনের কাছে আমেরিকার চূড়ান্ত পতনের সংকেত হিসেবে ধরা দিচ্ছে। বেইজিং বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, আমেরিকা এখন একসঙ্গে দুই ফ্রন্টে বড় কোনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে।

এই যুদ্ধের একটি নেতিবাচক দিক হলো আমেরিকার উন্নত অস্ত্রভাণ্ডার, বিশেষ করে টমাহক মিসাইলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ইরানের অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল বা এএসবিএমের ভয়ে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো এখন সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে। পেন্টাগনের এই রক্ষণাত্মক অবস্থান বেইজিংকে সাহসী করে তুলছে। চীন এখন বুঝতে পারছে যে, ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে কীভাবে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনীকে কোণঠাসা করা সম্ভব। এই অভিজ্ঞতা তারা ভবিষ্যতে তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরে প্রয়োগ করার পরিকল্পনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এখন ‘ইউজ-ইট-অর-লুজ-ইট’ (এখনই নয়তো কখনোই নয়) এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থায় রয়েছেন। আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যের চোরাবালিতে আটকে আছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই চীন তাইওয়ানের ওপর পূর্ণমাত্রার অবরোধ আরোপ করতে পারে। চীনের সামরিক বাহিনী গত কয়েক বছর ধরে তাইওয়ানের চারপাশে মহড়া দিলেও, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তারা একে বাস্তব রূপ দেওয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। তাইওয়ান প্রণালীতে যদি বেইজিং আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, তবে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে ধস নামবে এবং কার্যত মার্কিন অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়বে।

তবে চীনের অভ্যন্তরে এই সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বেইজিং সবসময় বিশৃঙ্খলার চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। চীনের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ তাইওয়ানিজদের নিজেদের আত্মীয় মনে করে এবং তারা কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সন্তানদের পাঠাতে ইচ্ছুক নয়। তদুপরি, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ চীনের অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা মন্দা তৈরি করেছে। এমন অবস্থায় কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে বলে মনে করেন অনেক চীনা বিশেষজ্ঞ।

তা সত্ত্বেও চীন যে হাত গুটিয়ে বসে নেই, তার প্রমাণ মিলছে ফিলিপাইন ও জাপানের সাথে তাদের ক্রমবর্ধমান বিরোধে। দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং পূর্ব চীন সাগরে জাপানের দাবিকৃত এলাকায় প্রবেশ করা এখন বেইজিংয়ের নিত্যদিনের কাজ। ইরান যুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে চীন এখন ড্রোন সোয়াম বা ঝাঁকবদ্ধ ড্রোন হামলা এবং হাইপারসনিক অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের কড়া বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে জাপানের মতো ছোট ভৌগোলিক আয়তনের দেশগুলোর জন্য চীনের এই দীর্ঘমেয়াদী মিসাইল ব্যারেজ (ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ) সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাবগুলো এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই। চীন এই যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং কৌশলগত অভিজ্ঞতাগুলো সরাসরি তাদের নিজস্ব সামরিক বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করছে। তেহরানকে কূটনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বেইজিং আসলে আমেরিকাকে একটি ক্লান্তিকর যুদ্ধে ব্যস্ত রাখছে। এর ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার যে নিরাপত্তা বলয় ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিচ্ছে যা মেরামতের সুযোগ দিন দিন কমে আসছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি ইরান যুদ্ধের কোনো সম্মানজনক প্রস্থান খুঁজে না পান, তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার পরাজয় কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আমেরিকার সামরিক সংস্থান যখন ফুরিয়ে আসছে, তখন বেইজিং তাদের সমরশক্তিকে সংহত করছে। ওয়াশিংটন হয়তো ছোট ছোট যুদ্ধে জিতছে, কিন্তু মহাযুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকে তারা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। সামনের দিনগুলোতে তাইওয়ান কিংবা জাপানের ওপর চীনের কোনো আকস্মিক পদক্ষেপ আমেরিকার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights