ইরানে মার্কিনি চাপ বুমেরাং হয়ে ধরা দেবে, বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সত্ত্বেও তেহরান অন্তত দুই থেকে তিন মাস বা তার চেয়েও বেশি সময় এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানকে ‘নতি স্বীকার’ করানোর যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা মূলত ইরানের রণকৌশল সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তার মতে, ইরান বর্তমানে নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে মনে করছে এবং তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুযুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

ওয়াশিংটন ধারণা করছে যে, কঠোর অবরোধের ফলে ইরান শিগগিরই জ্বালানি তেল মজুত করার সংকটে পড়বে এবং তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। তবে এলমাসরি এই ধারণাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন যে, মার্কিন অবরোধের মুখে ইরান ধারাবাহিকভাবে নিত্যনতুন সৃজনশীল পথ এবং বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বের করছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একটি ইরানি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি জানান, মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ৫২টি জাহাজ সফলভাবে মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধ এড়িয়ে চলাচল করতে সক্ষম হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যতটা কঠোর বলে দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রয়োগ ততটা নিশ্ছিদ্র নয়।

এই বিশ্লেষকের মতে, মূল প্রশ্নটি এখন আর এটি নয় যে ইরান কত দিন টিকে থাকতে পারবে; বরং প্রশ্নটি হলো এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে প্রস্তুত। যদি এই অচলাবস্থা আরও দুই বা তিন মাস স্থায়ী হয়, তবে তা কেবল মার্কিন অর্থনীতির জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার এবং সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, তা মোকাবিলা করা ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ইরানকে চাপে ফেলার যে চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করছে, তার নেতিবাচক প্রভাব উল্টো তাদের নিজেদের ওপরই পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইরান কেন এই প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করতে রাজি—তার ব্যাখ্যায় এলমাসরি বলেন, তেহরান এই যুদ্ধকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে। ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মনে করে, তারা যদি আজ বা কাল ট্রাম্পের দেওয়া শর্ত মেনে নেয়, তবে সেটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের’ পতন ডেকে আনবে। অস্তিত্বের এই সংকটের মুখে তারা যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক কষ্ট বা বিড়ম্বনা মেনে নিতে পিছপা হবে না। তাদের কাছে এই লড়াই কেবল তেলের বাজার বা অর্থনীতির নয়, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।

এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা অব্যাহত রাখে, তবে তা পুরো অঞ্চলকে এক অনিয়ন্ত্রিত অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে। ইরান যেহেতু তার মিত্রদের সহায়তা এবং বিকল্প বাণিজ্যিক পথ ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠেছে, তাই কেবল অবরোধ দিয়ে তাদের আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। বরং পাল্টা চাপের মুখে ইরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিলতর করে তুলছে।

পরিশেষে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব এখন কেবল সামরিক শক্তির মহড়া নয়, বরং ধৈর্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কঠোর নীতি বজায় রেখে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং আন্তর্জাতিক বিকল্প নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সেই চাপ রুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ‘দীর্ঘ খেলা’ বা লং গেমে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে, তা নির্ভর করছে কার অর্থনৈতিক সহনশীলতা কতটুকু এবং কারা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ক্ষয়ক্ষতির বোঝা টানতে সক্ষম, তার ওপর।

আপাতত বিশ্ববাসী এক অনিশ্চিত অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কায় এই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights