ইরান-ইরাক-লিবিয়া-ভেনেজুয়েলা, তেলের লোভে যাদের ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই আগ্রাসী ভূমিকা পালন করে আসছে। ইরান থেকে শুরু করে ইরাক, লিবিয়া কিংবা আজকের ভেনেজুয়েলা; ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, খনিজ তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ওয়াশিংটন বারবার বন্ধুত্বের আড়ালে দেশ ধ্বংসের খেলায় মেতেছে।

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যে সেই পুরনো সত্যই নতুন করে সামনে এসেছে। কারাকাসের বিপুল তেল ভাণ্ডার কব্জা করার যে নীলনকশা হোয়াইট হাউস তৈরি করেছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। অতীতেও ‘তরল সোনা’র লোভে কোথাও সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছে, আবার কোথাও মাদকের অজুহাতে গদি উল্টে দেওয়া হয়েছে।

এই সংঘাতের শুরুটা হয়েছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ইরানকে কেন্দ্র করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তেল যে বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে চলেছে, তা বুঝতে পেরেছিল আমেরিকা ও ব্রিটেন। ১৯৫১ সালে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেক যখন দেশের তেল সম্পদকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেন, তখনই সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সের রোষানলে পড়েন তিনি।

অপারেশন আজাক্সের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহ রেজা পেহলভিকে ক্ষমতায় বসানো হয়, যাতে পশ্চিমি কোম্পানিগুলো অবাধে তেল উত্তোলন করতে পারে। ১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লবের পর সেই নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হলেও ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে আজও নিষেধাজ্ঞার জাল বিছিয়ে রেখেছে ওয়াশিংটন।

তেল নিয়ে আমেরিকার এই আগ্রাসনের পরবর্তী শিকার ছিল ইরাক। ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা করেছিলেন তিনি আর ডলারে নয় বরং ইউরোতে তেল বিক্রি করবেন। মার্কিন ডলারের আধিপত্যে আঘাত হানার এই স্পর্ধা মেনে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের খোঁজের বাহানায় ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দামকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়। অথচ যুদ্ধের পর সেখানে কোনো মারণাস্ত্র পাওয়া না গেলেও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ঠিকই ইরাকের তেল খনিগুলোর দখল নেয়। বর্তমানে বাগদাদের তেলের একটা বড় অংশই মার্কিন সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়াকেও। সেনাশাসক মুয়ম্মর গদ্দাফি যখন আফ্রিকান গোল্ড দিনার চালুর মাধ্যমে ডলারে তেল বিক্রির প্রথা ভাঙতে চেয়েছিলেন, তখনই তাঁর পতনের ঘণ্টা বেজে যায়। ২০১১ সালের গৃহযুদ্ধে গদ্দাফির নির্মম মৃত্যুর পর লিবিয়া আজও স্থিতিশীল হতে পারেনি। কিন্তু সেই অস্থিরতার সুযোগে লিবিয়ার তেল সম্পদ ঠিকই আন্তর্জাতিক কালোবাজারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পশ্চিমি স্বার্থ রক্ষা করছে।

এখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যেও সেই একই ‘তেল রাজনীতি’ কাজ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার উচ্চমানের তেলের নিয়ন্ত্রণ ও তার লভ্যাংশ ভোগ করাই আমেরিকার মূল লক্ষ্য। মূলত তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ডলারের একাধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে অশান্তি আর ধ্বংসের বীজ বপন করাই যেন মার্কিন কূটনীতির প্রধান দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights