ইরান যুদ্ধের কারণে সার উৎপাদন ব্যাহত, বিশ্বজুড়ে চাষাবাদ বিপর্যয়ের শঙ্কা
অনলাইন ডেস্ক
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সার ও এর কাঁচামাল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ারা’র প্রধান নির্বাহী সভেইন তোরে হোলসেথার এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, এই সংকটের ফলে বিশ্বব্যাপী সপ্তাহে অন্তত এক হাজার কোটি মানুষের সমপরিমাণ খাবার উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলো এই পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
হোলসেথার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সার উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে এবং এর ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে একটি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হতে পারে। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সারের দাম বৃদ্ধির এই লড়াইয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অসহায় মানুষগুলোই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য হবে।
বর্তমানে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতির কারণে বিশ্বে প্রায় পাঁচ লাখ টন নাইট্রোজেন সারের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে হোলসেথার জানিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, নাইট্রোজেন সারের ঘাটতির কারণে প্রথম মৌসুমেই অনেক ফসলের ফলন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। সারের বাজার অত্যন্ত বৈশ্বিক হওয়ায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হলেও এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোই সবচেয়ে দ্রুত ও সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন দেশগুলোতে যেখানে আগে থেকেই সারের অভাব রয়েছে, সেখানে এই সংকটের কারণে ফলন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সারাবিশ্বে ফসলের আবাদের সময় ভিন্ন ভিন্ন হয়; যেমন বর্তমানে যুক্তরাজ্যে রোপণের মূল সময় চললেও এশিয়ায় কৃষকরা সবেমাত্র তাদের কাজ শুরু করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ায় এই সারের অভাবের প্রকৃত প্রভাব চলতি বছরের শেষ দিকে বোঝা যাবে, যখন কম ফলন নিয়ে ফসল ঘরে উঠবে অথবা অনেক ক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনই হবে না।
সিঙ্গাপুরের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল টেং মনে করেন, অনেক দেশের কাছে হয়তো বর্তমান মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে কিন্তু এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সামনের মাসগুলোতে চালের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষকরা বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছেন কারণ তাদের উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত ফসলের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ার ফলে কৃষকদের নাভিশ্বাস উঠলেও বাজারের অস্থিতিশীলতায় তারা সঠিক দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া ও ফসফেট সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সারের দাম এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংঘাত অব্যাহত থাকলে ধনী দেশগুলো তাদের উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে খাদ্য মজুদ করবে, যার ফলে দরিদ্র দেশগুলো খাদ্য ঘাটতির মুখে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাবারের দাম নিয়ে এক অসম নিলাম যুদ্ধ শুরু হবে।
যুক্তরাজ্যের খাদ্য ও পানীয় ফেডারেশন পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডও মনে করছে যে, সেপ্টেম্বর নাগাদ এই মূল্যস্ফীতি কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ ধনী দেশগুলোর সাধারণ মানুষও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হবে, যা পরোক্ষভাবে বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে আরও উসকে দেবে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটের কারণে ২০২৬ সালের মধ্যে অতিরিক্ত সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার কবলে পড়তে পারে। বিশেষ করে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।
