ইরান যুদ্ধে কে আগে পিছু হটবে?

অনলাইন ডেস্ক

যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ইরানকে বাধ্য করতে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক শক্তিতে ব্যাপক এগিয়ে থাকার পরও তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ প্রত্যাশিত ফল না আনায় যুদ্ধটি এখন অনেকটা ‘কে আগে পিছু হটে’- সেই পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সরকারের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ওয়াশিংটনের যুদ্ধকৌশল ও চাপ প্রয়োগের সক্ষমতার সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

মাসগ্রেভ বলেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- কে কতটা সময় পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি সহ্য করতে পারবে এবং নিজেদের অবস্থান থেকে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত হবে।

তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন হোক বা তেহরান- অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক ক্ষতি আপনি কতদিন ধরে সহ্য করতে পারবেন, সেই সময়টাই প্রমাণ করে আপনি আরও ভালো একটি চুক্তি পাওয়ার জন্য কতদূর যেতে প্রস্তুত।”

পিছু হটতে নারাজ ইরান
মাসগ্রেভের মতে, ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা এই মুহূর্তে পিছু হটার কোনও লক্ষণ দেখাতে চাইছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে দুর্বলতা প্রকাশ করলে তা দেশের অভ্যন্তরে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকেই তারা কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছেন।

ইরানের কট্টরপন্থীদের লক্ষ্য শুধু নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা নয়; বরং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলার চেষ্টা করাও তাদের কৌশলের অংশ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরান সেই বিষয়টি কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মাসগ্রেভ বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ট্রাম্প যতটা সহজে জয় করা যাবে বলে ধারণা করেছিলেন, বাস্তবে তা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।

কেন প্রত্যাশিত ফল আনতে পারছে না মার্কিন সামরিক শক্তি?
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বিপুল বিমানশক্তি এবং অত্যাধুনিক গোলাবারুদ রয়েছে। কিন্তু এসব সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেও ইরানকে ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক অবস্থানে আনতে পারেনি ওয়াশিংটন- এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

মাসগ্রেভের ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- আমেরিকার বিমানশক্তি, আমেরিকার গোলাবারুদ এবং আমেরিকার চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ব্যবহার করেও তিনি যা চান, তা অর্জন করতে পারেননি।”

অর্থাৎ সামরিক হামলায় ইরানের অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতার ওপর ক্ষয়ক্ষতি করা গেলেও তেহরানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে না। ফলে যুদ্ধের সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

কে আগে পিছু হটবে?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রকে একদিকে যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি, অবরোধ এবং অব্যাহত সামরিক চাপ।

ফলে যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় অনেকটাই নির্ভর করতে পারে কোন পক্ষ আগে সমঝোতার পথে এগিয়ে আসে তার ওপর। একে অনেকটা ‘কে আগে চোখের পলক ফেলবে’- এমন পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরানের কট্টরপন্থীরা যদি মনে করেন, আরও কিছুদিন চাপ সহ্য করে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আরও বড় ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব, তাহলে তারা সংঘাত দীর্ঘায়িত করার পথেই থাকতে পারেন। বিপরীতে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যদি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ওয়াশিংটনও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে বাধ্য হতে পারে।

সব মিলিয়ে, সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও ইরানকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাধ্য করতে না পারা ট্রাম্পের যুদ্ধকৌশলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই সামরিক শক্তির পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক সংকল্প ও ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতাই সংঘাতের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights