ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প দিক ভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন: এপির বিশ্লেষণ

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক বিতর্কিত ও অস্থির কৌশল গ্রহণ করছেন। প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে শুরুতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা বললেও বর্তমান পরিস্থিতির চরম অবনতিতে তিনি এখন সরাসরি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন। এই পরিবর্তনশীল অবস্থান বিশ্বজুড়ে মার্কিন রণকৌশল এবং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

শনিবার ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে অবস্থানকালে ট্রাম্প ইরানকে এক চরম আল্টিমেটাম দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে সেগুলো মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। ট্রাম্পের এই কড়া হুঁশিয়ারি তার পূর্ববর্তী অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে তিনি আগে কেবল ইরানের সামরিক ঘাঁটি এবং নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি রণকৌশল নিয়ে খোদ মার্কিন রাজনীতির অন্দরমহলেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটররা অভিযোগ করেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ট্রাম্প এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এড মার্কি এই হুমকিকে সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বেসামরিক বিদ্যুৎ গ্রিড লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এটি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ হারানোরই বহিঃপ্রকাশ।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এই কঠোর অবস্থানকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দেশের জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে যুদ্ধের রসদ জোগাচ্ছে। তাই গ্যাসচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো বৈধ সামরিক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে ট্রাম্পের এই ৫১ শব্দের সংক্ষিপ্ত ও আক্রমণাত্মক বার্তাটি কোনো আইনি বা সামরিক পর্যালোচনার মাধ্যমে এসেছে কি না, তা নিয়ে খোদ সামরিক আইন বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ট্রাম্পের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করছে। এই চাপ সামলাতে ট্রাম্প প্রশাসন গত শুক্রবার কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানো কিন্তু এই পদক্ষেপ মিত্রদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে যে ওয়াশিংটন আসলে ঠিক কী অর্জন করতে চাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প শুরুতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক মিত্র দেশ এই ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ট্রাম্প একাই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা বলেন এবং পরবর্তী সময়ে আবার অন্যান্য দেশের ওপর দায়িত্ব চাপানোর ইঙ্গিত দেন। এই যে ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন, তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। নর্থ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসও এই বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেছেন, নিজে সংকট তৈরি করে হঠাৎ করে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বেসামরিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা চালালে হাসপাতাল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়বে, যা জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থী। টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সাবেক সামরিক আইনজীবী জিওফ্রে কর্ন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেছেন। এই ধরণের নির্বিচার হামলা হলে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য এটি একটি নৈতিক সংকট তৈরি করবে, যেখানে তাদের অপরাধমূলক আদেশ পালন বা অবাধ্য হওয়ার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেবে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে। ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতও ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পরিবর্তে কিছুটা সংযম প্রদর্শনের পরামর্শ দিয়েছেন যাতে পরবর্তী সরকার দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের এই আগে গুলি ছুড়ে পরে লক্ষ্য স্থির করার নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিশ্চিত ও প্রলয়ংকরী পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights