উন্নয়নবঞ্চিত ছয় শ্রেণির মানুষ

ইমরান চৌধুরী

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নচিত্রে অগ্রগতি থাকলেও এর সুফল সব শ্রেণিতে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। দেখা গেছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, নাগরিক অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছয় শ্রেণির জনগোষ্ঠী এখনো পিছিয়ে আছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, দলিত ও আদিবাসী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী, শিশু ও যুবকদের ক্ষেত্রে এ বঞ্চনা ও বৈষম্য বিশেষভাবে স্পষ্ট। বাংলাদেশের গত এক দশকের এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অগ্রগতি ‘কাউকে পেছনে না রাখার দৃষ্টিভঙ্গি’ বিশ্লেষণ করে এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বহুমাত্রিক ঝুঁকিই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রাখার প্রধান কারণ। আয় ছাড়াও শিক্ষা ও দক্ষতা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ, পেশা, ভৌগোলিক অবস্থান, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়, নাগরিক পরিচয় এবং বিভিন্ন ধরনের অভিঘাত মানুষের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মাদারীপুরে দারিদ্র্যের হার ৫৪ শতাংশ হলেও নোয়াখালীতে তা ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের গড় হার ১৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় গড়ের তুলনায় বিভিন্ন অঞ্চলের অবস্থার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য রয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও রংপুরে খাদ্য অনিরাপত্তার হার ১৮ শতাংশ। সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর ৭০ শতাংশ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। জাতীয়ভাবে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার হার ১৬ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত তরুণরা বেকারত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের অসামঞ্জস্যের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা তরুণদের বঞ্চনা আরও গভীর। প্রান্তিক তরুণদের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বও সীমিত। শিক্ষায় সামগ্রিক অগ্রগতি হলেও অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। তথ্যানুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার নরসিংদীতে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ, বিপরীতে ঝালকাঠিতে ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশ। নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার কক্সবাজারে ৫২ দশমিক ২ শতাংশ হলেও ঝালকাঠিতে ৮৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে কক্সবাজারে এ হার ৩৩ শতাংশ, বিপরীতে ঝালকাঠিতে ৬৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। তথ্যানুযায়ী, বান্দরবানে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যু হয় ৮৬ জনের, যেখানে বাগেরহাটে তা প্রায় ৫ জন। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর হার বান্দরবানে ১১৩ দশমিক ৫০, মাগুরায় ১৫ দশমিক ২০। নবজাতক মৃত্যুর হারও বান্দরবানে ৭৭ দশমিক ৯০, যেখানে মাদারীপুরে শূন্য। নিরাপদ পানির সুবিধায়ও ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। শরীয়তপুরে নিরাপদ পানির প্রবেশাধিকার মাত্র ১ দশমিক ২০ শতাংশ, বিপরীতে ঢাকায় ৮৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। যথাযথ স্যানিটেশন সুবিধায় বান্দরবানে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, যেখানে পিরোজপুরে তা ৭৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিদ্যুৎ সুবিধার ক্ষেত্রেও রাঙামাটিতে ৫১ শতাংশ, বিপরীতে চাঁদপুর ও নরসিংদীতে তা ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও উন্নয়নের সুযোগ সমান নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকার সীমিত। তাদের মধ্যে তীব্র লিঙ্গভিত্তিক কর্মসংস্থান বৈষম্য রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী নিয়ে বিভাজিত তথ্যের ঘাটতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে কম অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও ভূমির অধিকারে বৈষম্য রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণও সীমিত। তথ্যের ঘাটতির পাশাপাশি তথ্য ব্যবহারে সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এ জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপুষ্টি ও শিশুশ্রম বাড়ার পাশাপাশি নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিবর্তন এবং বাল্যবিয়ের সমস্যার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। এসব এলাকায় বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শিশুশ্রম বাড়ছে। জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন সহায়তাও এখনো অপর্যাপ্ত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘জাতীয় গড় দিয়ে দেশের উন্নয়ন পরিমাপ করলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা আড়ালে থেকে যায়। তাই এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়নে শুধু সামগ্রিক সূচকের উন্নতি নয়, জাতীয় গড়ের সঙ্গে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অবস্থার ব্যবধান কতটা কমছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights