এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিলেন মাইক্রোসফট সিইও

অনলাইন ডেস্ক

মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেল্লা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। নিজের একটি ব্যক্তিগত ব্লগ পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এআই ব্যবহারের জন্য মূলত দুবার মূল্য পরিশোধ করছে, যার একটি তারা নিজেরাও টের পাচ্ছে না।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব বলেন, আপনারা মূলত বুদ্ধিমত্তার জন্য দুবার মূল্য মেটাচ্ছেন; প্রথমবার অর্থের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়বার তার চেয়েও মূল্যবান জিনিসের মাধ্যমে—যা হলো আপনার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও গোপনীয় জ্ঞান (প্রোপ্রাইটরি নলেজ), যা ওই এআই-কে কার্যকর করে তুলতে আপনাকে শেয়ার করতে হচ্ছে। মডেলটিকে যত নিখুঁতভাবে কাজ করাতে চাইবেন, তাকে তত বেশি এই নিজস্ব তথ্য ও জ্ঞান সরবরাহ করতে হবে।

এই ধারণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নাদেল্লা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ কেনেথ অ্যারোর বিখ্যাত ‘ইনফরমেশন প্যারাডক্স’ বা তথ্য-সংক্রান্ত আপাতবিরোধের সূত্রটি টেনে এনেছেন। অ্যারো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তথ্য কেনাবেচা করা কঠিন, কারণ একজন ক্রেতা তথ্য হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তার সঠিক মূল্য বুঝতে পারেন না; আবার একবার তথ্য পেয়ে গেলে সেটি কেনার জন্য আর অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন থাকে না। সত্য নাদেল্লার মতে, এআই-এর যুগ এই সমস্যাটিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে একটি ‘বিপরীত তথ্য প্যারাডক্স’ সৃষ্টি করেছে। এখানে ক্রেতা যা কিনছেন, তা ব্যবহার করার স্বার্থেই উল্টো নিজের মূল্যবান জ্ঞান বিক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

তড়িৎ প্রকৌশলে পড়াশোনা করা এই প্রযুক্তিবিদ সতর্ক করে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অসমতা আরও বৃদ্ধি পায়, যেখানে এআই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি আপনার ব্যবহারের সূত্র ধরে আপনার সম্পর্কে প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শিখে নেয়, অথচ বিনিময়ে তারা কী শিখছে সে সম্পর্কে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কিছুই জানতে পারে না।

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে নাদেল্লা মনে করেন, শুধুমাত্র ডেটা আপলোড করার ওপর নয়, বরং এআই ব্যবহারের মাধ্যমে যে জ্ঞান তৈরি হচ্ছে, তার ওপর প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। তার মতে, কর্মীরা এআই-কে যে প্রম্পট বা নির্দেশনা দিচ্ছেন, এআই-এর ভুলত্রুটি যেভাবে সংশোধন করছেন এবং কাজের যে নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে, তার প্রতিটিই একেকটি মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মিথস্ক্রিয়াই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজারে এগিয়ে থাকার মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা কেবল এআই ব্যবহারের অজুহাতে কোনোভাবেই অন্য কারও হাতে চলে যেতে দেওয়া উচিত নয়। নাদেল্লা একে ‘লার্নিং লুপ’ বা শেখার চক্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যার মালিকানা প্রতিষ্ঠানের নিজের হাতেই থাকা উচিত।

এই লক্ষ্য অর্জনে এআই যুগের জন্য একটি নতুন ‘নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের দেয়াল’ (ট্রাস্ট বাউন্ডারি) তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছেন মাইক্রোসফট সিইও। এর ফলে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, এআই-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বিশেষ বিশ্লেষণ এবং অভ্যন্তরীণ কলাকৌশলগুলো যেন প্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া বাইরের কোনো মডেলের উন্নয়নে ব্যবহার করা না যায়, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে কোনো একক এআই সরবরাহকারীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এর পরিবর্তে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এআই মডেলের মাঝে সহজে পরিবর্তন করা যায় এবং ডেটা ও কাজের নিজস্ব ধারার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে, যা ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করবে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকেও তিনি এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেছিলেন যে, কে কত বড় মডেল তৈরি করছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এমন একটি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আসল বিষয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রযুক্তি ও তথ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। তার এই নতুন সতর্কবার্তা সেই ধারণাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights