এই ঈদে আনন্দও নেই, শান্তিও নেই

সৈয়দ নোমান, ময়মনসিংহ

ছোট্ট ড্রয়িং রুমটির সোফার এক কোণে বসে আছেন রহিমা খাতুন। অম্লান মুখে কথা বলছেন। মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে বোধহয় চোখের জলও শুকিয়ে গেছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে বারবার অস্পষ্ট স্বরে একা একাই বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছিলেন, ‘এই ঈদে আনন্দও নাই, শান্তিও নাই।’ বলছিলাম ময়মনসিংহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত রেদোয়ান হোসেন সাগরের মায়ের কথা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ১৯ জুলাই নগরের মিন্টু কলেজ এলাকায় গুলিতে কলেজছাত্র রেদোয়ান হোসেন সাগর নিহত হন। কথার একপর্যায়ে সাগরের মা রহিমা খাতুন নিজেকে সামলাতে না পেরে হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে জানালেন পুরোনো স্মৃতিগুলো। বলেন, ‘গতবার ঈদে ৩ হাজার টাকা দিছিলাম। সেই টাকায় ২টা শার্ট আর ২টা প্যান্ট কিনেছিল। ঈদের দিন সকালে কখনোই ডাক দিতে হতো না। আগের দিন রাতেই ঈদের নামাজে যাওয়ার জন্য পাঞ্জাবি-পায়জামা রেডি করে রাখত আমার বাবা। সবার আগে ঘুম থেকে উঠে যেত। পরে বাসার সবাইকে ডেকে তুলত। কিন্তু এবারের ঈদে আমার ছেলে নেই, সকালের ডাকাডাকিও থাকবে না। বাড়িতে থাকবে শূন্যতা।’ ‘এবারই সাগর ছাড়া প্রথম ঈদ, সন্তান ছাড়া কি মায়ের কোনোদিন ঈদ হয়? ছেলেকে ছাড়া ক্যামনে ঈদ করব?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ আক্ষেপ এখন সাগরের মা রহিমা খাতুনের। ঈদের প্রস্তুতির সবকিছুতে যেখানে মায়ের তদারকি থাকে, এখন সন্তানকে হারিয়ে সেই মায়ের কণ্ঠে করুণ সুর। আকাশের তারা হয়ে যাওয়া সেই নাড়িছেঁড়া সন্তান ছাড়া আসছে ঈদ যে বেদনাময় একটি দিন হতে চলছে সেটা স্পষ্টভাবেই দেখা মিলেছে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরঙ্গি মোড় এলাকায় সাগরের বাসায় গিয়ে। এমনই বিষণ্ন, শোকস্মৃতি তুলে ধরে সাগরের অনার্সপড়ুয়া ছোট বোন আফিয়া তাবাসসুম সুপ্তি জানান, ‘গতবার একসঙ্গে শপিং করেছি। আমরা একই কালারের জুতাও কিনছিলাম। ঈদের আগের দিন মানে শেষ রোজায় আমাকে ও চাচাতো ভাইবোনদের নিয়ে সাগর ভাই ঘুরতেও যায়। ঈদের আগেই ঈদানন্দ পরিবেশ তৈরি করত সবসময় সে। আমার বড় হলেও আমাদের ভাইবোনের সম্পর্কটা সবসময় বন্ধুর মতো ছিল।’ সুপ্তি আরও জানান, ভাইয়ার (সাগর) পোশাকের প্রতি টান ছিল না, খাওয়া-দাওয়া আর ঘোরাফিরার প্রতি আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি। ঈদের দিন বলত, ঈদ মানেই খাওয়া আর তোদের নিয়ে ঘোরাফেরা করা। চটপটি, পোলাও, রোস্ট খুব পছন্দ করত। এমনকি বারবি কিউ করত সে। প্রতি ঈদেই জয়নুল উদ্যান পার্কে যেত আমাদের নিয়ে। বিকাল পর্যন্ত আমরা আনন্দ করতাম। এরপর ভাইয়া বন্ধুদের সময় দিত। কিন্তু এই ঈদে কী করব আমরা…?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights