একের পর এক বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা, বাড়ছে অনিশ্চয়তা

অনলাইন ডেস্ক
একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পোশাক কারখানা। অনিশ্চয়তা বাড়ছে শ্রমিকদের মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েকটি বড় কারখানা বন্ধ হয়ে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে আরও কারখানা বন্ধ হতে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কোরবানির ঈদের পর থেকেই পোশাক শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে এসে শ্রমিকরা জানতে পারেন, তাদের চাকরি আর নেই।

শ্রমিকদের অভিযোগ, যথাযথ পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। অনেকেই বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও হঠাৎ চাকরি হারিয়ে এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

অন্যদিকে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় অবস্থিত ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক ও কর্মচারী একসঙ্গে কর্মহীন হয়েছেন।

কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে শ্রমিকদের জীবনে। মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার হঠাৎ করেই জীবিকার সংকটে পড়েছে।

ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন কাজ করার পরও তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলছেন, অভিজ্ঞ শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি বেতন দিতে হয় বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে পুরোনো শ্রমিকদের বাদ দিয়ে নতুন শ্রমিক নিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রফতানিতে।

দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, ডলার সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে শ্রম ব্যয়ও বেড়েছে। যদিও শ্রমিকদের জন্য এটি ইতিবাচক, তবে উৎপাদনশীলতা না বাড়লে অনেক দুর্বল কারখানা অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে পারছে না।

চতুর্থত, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে কার্যক্রম সংকুচিত করছে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছিলেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও বহু কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক কারখানা বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাচ্ছে। উৎপাদন কমলেও ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, ভাড়া এবং প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নিয়মিত। ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, আর্থিক সংকটই বর্তমানে কারখানা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। তিনি বলেন, ‘‘রুগ্ন ও বন্ধপ্রায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে সংকটে থাকা কারখানাগুলো কোনও ধরনের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না।’’

তার মতে, যেসব কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সব সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও চাকরি-পরবর্তী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়িক মন্দাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা। এজন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা, ব্যাংকঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রয়োজন।

অন্যথায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে বড় মূল্য দিতে হবে শ্রমিকদেরই। যারা বছরের পর বছর দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে কাজ করেছেন, তারাই আজ চাকরি হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights