এক ভুলের মাশুল, যেভাবে আমেরিকার বন্ধু থেকে পর হয়ে গেলেন নেতানিয়াহু

অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ছিল ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান- উভয় দলেরই প্রায় অভিন্ন অবস্থান। সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের এই দ্বিদলীয় ঐকমত্যকে অনেকেই ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখতেন। তবে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ওয়াশিংটনভিত্তিক সাংবাদিক সাঈদ আরিকাত লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলই সেই দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে দুর্বল করে দিয়েছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা। এর ফলে ইসরায়েল ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে এবং ডেমোক্রেটদের বড় একটি অংশের সমর্থন হারাতে শুরু করে।

সাঈদ আরিকাতের মতে, এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৫ সালে। সে সময় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আপত্তি উপেক্ষা করে রিপাবলিকানদের আমন্ত্রণে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া নেতানিয়াহুর ভাষণ ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক নেতার কাছে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ধরা পড়ে। এরপর থেকেই ওয়াশিংটনে ইসরায়েলকে ঘিরে আগের দ্বিদলীয় ঐকমত্যে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি এবং গোলান মালভূমি নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তকে নেতানিয়াহু স্থায়ী কৌশলগত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু লেখকের মতে, এসব অর্জন ছিল নির্দিষ্ট প্রশাসননির্ভর, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় নীতির স্থায়ী পরিবর্তন নয়।

গাজা যুদ্ধের পর এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে উল্লেখ করেছেন আরিকাত। তাঁর ভাষ্য, ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে ব্যাপক সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিলেও, পরবর্তী সময়ে গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা, মানবিক সংকট এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে।

বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছে। একসময় যেসব বিষয় ঐতিহাসিক মিত্রতার আলোকে মূল্যায়িত হতো, এখন অনেকের কাছে তা মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও দখলদারত্বের প্রশ্নে আলোচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক Economist ও YouGov-এর একটি জরিপের তথ্যও তুলে ধরেছেন লেখক। জরিপ অনুযায়ী, ৪৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা অনুযায়ী নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা উচিত। আর ৪৭ শতাংশের মত, তিনি গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছেন। লেখকের মতে, একসময় যেখানে ইসরায়েলের সমালোচনা মার্কিন রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল, সেখানে এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ।

সাঈদ আরিকাত আরও লিখেছেন, নেতানিয়াহুর জোটে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের নীতিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিশ্লেষণের উপসংহারে তিনি বলেন, সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বৈধতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা আরও কঠিন। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রভাব কমার কারণ অনুসন্ধান করা হলে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলকেই দেখা হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সূত্রঃ আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights