‘এটা কালি নয়, আমার মেয়ের রক্ত’

গণিতের খাতায় চার অঙ্কের বিয়োগ করছিল রিতাজ আবদুল রহমান রিহান। স্কুলে গণিতের শিক্ষক প্রশ্নগুলো লিখে সমাধানের জায়গা ফাঁকা রেখেছিলেন। নয় বছর বয়সি রিতাজ সেই ফাঁকা জায়গায় উত্তর লিখছিল। কিন্তু উত্তর লেখার আগেই সেই ফাঁকা জায়গা ভরে গেল তার রক্তে।

গতকাল বৃহস্পতিবার গাজার উত্তরাঞ্চলীয় বেইত লাহিয়ার আবু উবাইদা বিন আল-জাররাহ স্কুলে ক্লাস চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। কাছেই মোতায়েন থাকা ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয় রিতাজ। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বাবা-মা শেষবারের মতো দেখার আগেই চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বাবা আবদুল রহমান রিহান বলেন, ‘প্রতিদিন আমার মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাই, যাতে সে পৃথিবীর অন্য সব শিশুর মতো শিক্ষা নিতে পারে। আজ তাকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার এক ঘণ্টার মাথায় খবর পেলাম, সে মারা গেছে। আমি কখনো কল্পনাই করিনি, স্কুলে গিয়ে সে নিহত হবে।’

ইসরায়েলি হামলায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর রিতাজের পরিবার অস্থায়ী তাঁবুতে থাকছেন। প্রতিদিন প্রায় এক কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যেত রিতাজ। সে ছিল পরিবারের প্রথম সন্তান।

তার বাবা বলেন, ‘আমি চেয়েছি পৃথিবীর সব শিশুর মতোই সে শিক্ষাগ্রহণ করুক, স্কুলে যাক। দুই বছর ধরে চলা গণহত্যার পরও সে বেঁচে ছিল, সুস্থ ছিল, স্কুলব্যাগ ও খাতা বহন করার বয়স হয়েছে দেখে আমরা খুশি ছিলাম। অবশেষে সে স্কুলে ফিরতে পেরেছে।’

মরদেহের সঙ্গে রিতাজের মা ওলাকে তার খাতাটিও দেওয়া হয়। তিনি সেটি ভালো করে দেখেন, খোঁজেন মেয়েটি তার শেষ সময়ে কী করছিল। রক্তমাখা পাতা ধরে তিনি বলেন, ‘এই হলো তার খাতা, আর এখানে আজকের পাঠ, যা সে শেষ করতে পারেনি। এগুলো আমার মেয়ের রক্তে ভেজা পাতা। এটা কালি নয়, এটা আমার মেয়ের রক্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুলটি নিরাপদ এলাকায়। এটি হলুদ রেখার কাছেও না। সেজন্য মেয়েকে সেখানে পাঠাতে আমরা চিন্তাহীন ছিলাম। আজ সকালে আমি তাকে পোশাক পরিয়ে দিয়েছি, চুল আঁচড়ে দিয়েছি, বেঁধে দিয়েছি। আরও সে ফিরেছে নিথর হয়ে, মুখ রক্তে ভেজা।’

রিতাজের মা ওলার কাছ থেকে আরও একটি করুণ সত্য বেরিয়ে আসে। ইসরায়েলি হামলায় তিনি এর আগেই হারিয়েছেন তার মা, বোন, বোনের সন্তান এবং চাচাকে। তিনি বলেন, ‘আমরা আর কাউকে হারাতে চাই না, একের পর এক মৃত্যুতে আমরা ক্লান্ত।’

স্কুলটি গাজার উত্তরে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলি বাহিনী এই সীমানা নির্ধারণ করে। এর ফলে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা নিষিদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ‘হলুদ রেখা’ বরাবর মোতায়েন ইসরায়েলি স্নাইপার ও আর্টিলারি ইউনিট নিরাপদ এলাকার ভেতরের জনবসতিতেও নিয়মিত গুলি চালাচ্ছে।

প্রতিমাসে ইসরায়েলি বাহিনী এই সামরিক সীমানা আরও বাড়িয়ে নিচ্ছে, ফলে জমি দখল বাড়ছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর বাড়ি ফেরার অনুমতি পাওয়া হাজারো বাসিন্দাকে আবারও বাস্তুচ্যুত হতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি এলাকায় আবাসিক ভবন ও বাড়িঘরে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights