এবার ভারতের বিমান খাতে আদানির নতুন বাজি!

অনলাইন ডেস্ক

ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ নতুন একটি এয়ারলাইন চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন বাজারে বর্তমানে ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়ার যে কার্যত দ্বৈত আধিপত্য রয়েছে, তা নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।

বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এখনও চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আদানি গ্রুপ নতুন এয়ারলাইনস চালু করা কিংবা বিদ্যমান কোনও এয়ারলাইনসে অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে।

এই উদ্যোগ আদানি গ্রুপের আগের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বন্দর, বিদ্যুৎ, বিমানবন্দর ও সিমেন্টসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারী এই শিল্পগোষ্ঠী এর আগে জানিয়েছিল, তারা বিমান পরিবহন ব্যবসায় প্রবেশের পরিকল্পনা করছে না।

বর্তমানে আদানি গ্রুপ ভারতের আটটি বিমানবন্দর পরিচালনা করছে, যার মধ্যে মুম্বাইয়ের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরও রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিমানবন্দর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সরকারের উৎসাহ
প্রথম সূত্রের দাবি, গত বছর আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এবং ইন্ডিগোর পরিচালনাগত সংকটের পর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোকে নতুন এয়ারলাইনস চালুর সম্ভাবনা বিবেচনার জন্য অনানুষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করেছে।

সূত্রটি জানায়, গত ডিসেম্বরে পাইলট সংকটের কারণে ইন্ডিগো হাজারো ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়। এতে সারাদেশে বিমান চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে। অন্যদিকে এয়ার ইন্ডিয়াও দুর্ঘটনার পর থেকে নানা ধরনের পরিচালনাগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চাপের মুখে রয়েছে।

সূত্রটির ভাষায়, “এটি কঠিন ব্যবসা। তবে জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আদানি গ্রুপ সম্ভাবনাটি যাচাই করতে চায়। সরকারও মনে করছে, এয়ার ইন্ডিয়া ও ইন্ডিগোর সমস্যার কারণে বাজারে আরেকটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ এয়ারলাইনসের প্রয়োজন রয়েছে।”

কঠিন ব্যবসা, তবু বড় বাজি
বিশ্লেষকদের মতে, বিমান পরিবহন খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং কম মুনাফার ব্যবসা। গত ১৫ বছরে উচ্চ কর, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে কিংফিশার এয়ারলাইনস, জেট এয়ারওয়েজ ও গো ফার্স্টের মতো একাধিক ভারতীয় এয়ারলাইনস দেউলিয়া হয়ে গেছে।

এমন বাস্তবতায় আদানি গ্রুপের সম্ভাব্য বিনিয়োগ শিল্পপতি গৌতম আদানির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর একটি হতে পারে।

ফোর্বসের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক গৌতম আদানি বর্তমানে এশিয়ার দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি।

বাজারে ইন্ডিগো-এয়ার ইন্ডিয়ার আধিপত্য
ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বিমান পরিবহন বাজারগুলোর একটি। তবে বাজারটিতে কার্যত দুটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহনে ইন্ডিগোর বাজার অংশীদারিত্ব ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে এয়ার ইন্ডিয়ার দখলে রয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ বাজার।

এই পরিস্থিতিতে নতুন একটি বড় এয়ারলাইনস চালু হলে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

কাতার এয়ারওয়েজের ভারতের সাবেক প্রধান রাজন মেহরা বলেন, “আদানি গ্রুপের প্রবেশ ভারতের বিমান পরিবহন শিল্পের চিত্র বদলে দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, যেন সব এয়ারলাইনসের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকে।”

বিদ্যমান এয়ারলাইনসেও বিনিয়োগের চিন্তা
দ্বিতীয় সূত্র জানিয়েছে, আদানি গ্রুপ শুধু নতুন এয়ারলাইনস চালুর বিষয়ই নয়, বিদ্যমান কোনও এয়ারলাইনসের শেয়ার কেনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।

তার ভাষায়, “সব ধরনের বিকল্পই আলোচনায় রয়েছে।”

আগে যা বলেছিলেন আদানির ছেলে
গত ডিসেম্বর আদানি গ্রুপের বিমানবন্দর বিভাগের পরিচালক এবং গৌতম আদানির ছোট ছেলে জিত আদানি বলেছিলেন, তাদের গ্রুপ বিমান ব্যবসায় আগ্রহী নয়।

তার যুক্তি ছিল, বিমান পরিবহন ব্যবসায় লাভের পরিমাণ খুবই কম এবং এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য যে মানসিকতা প্রয়োজন, তা আদানি গ্রুপের নেই।

তিনি তখন বলেছিলেন, “আমাদের মূল দক্ষতা হলো দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণ ও দক্ষতার সঙ্গে তা পরিচালনা করা।”

বিমানবন্দরেই বড় বিনিয়োগ অব্যাহত
যদিও বিমান পরিবহন ব্যবসায় প্রবেশ নিয়ে আগে অনীহা ছিল, তবুও বিমানবন্দর অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে আদানি গ্রুপ।

গত মাসে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভারতের ছয়টি বিমানবন্দর ঘিরে হোটেল, শপিং কমপ্লেক্স, অফিস ভবনসহ বাণিজ্যিক অঞ্চল গড়ে তুলতে তারা ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে।

এদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নির্ধারিত যাত্রীবাহী এয়ারলাইনসে অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করার জন্যও সরকারের কাছে আবেদন করেছে আদানি গ্রুপ।

তবে স্বাধীন বিমান পরিবহন বিশ্লেষক ব্রেন্ডান সোবি সতর্ক করে বলেছেন, একই প্রতিষ্ঠান যদি বিমানবন্দর এবং এয়ারলাইনসে- দুই খাতেই বড় অংশীদার হয়, তাহলে স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

শেয়ারবাজারে প্রতিক্রিয়া
আদানি গ্রুপের সম্ভাব্য এয়ারলাইনস পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার মুম্বাই শেয়ারবাজারে আদানি এন্টারপ্রাইজেসের শেয়ারদর ৩ শতাংশের বেশি কমে যায়।

একই দিনে ইন্ডিগোর শেয়ারও ১ শতাংশের বেশি কমে যায়। তবে আর্থিক সংকটে থাকা স্পাইসজেটের শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি আদানি গ্রুপ শেষ পর্যন্ত বিমান পরিবহন খাতে প্রবেশ করে, তবে তা শুধু ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকেই চ্যালেঞ্জ জানাবে না, ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন শিল্পে প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়েরও সূচনা করতে পারে। সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights