এ কেমন দ্বিচারিতা, ইরানে বোমা ফেলে সৌদিকে পরমাণু প্রযুক্তি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের ওপর সামরিক হামলা ও উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় ৩০ বছর মেয়াদি এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আর্থিক মূল্য আনুমানিক হাজার কোটি ডলার। চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল শর্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সৌদি আরবের মাটিতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও পারমাণবিক অসংযোজন নীতির ক্ষেত্রে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

প্রস্তাবিত এই দ্বিপক্ষীয় পারমাণবিক চুক্তিটি অতি শীঘ্রই চূড়ান্ত স্বাক্ষরের মাধ্যমে রূপ পেতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানি মন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান এই ঐতিহাসিক নথিতে স্বাক্ষর করবেন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ক্রিস রাইটের মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময়ই এই সমঝোতার মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তির আওতায় আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল ভূমিকা দিয়ে সৌদি পারমাণবিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফলে রিয়াদকে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দী দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

চুক্তির মূল রূপরেখা অনুযায়ী, আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবে নতুন পাওয়ার রিয়্যাক্টর ও পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। যার মধ্যে অন্যতম সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস ইলেকট্রিক ও তাদের তৈরি এপি-১০০০ রিয়্যাক্টর। পাশাপাশি, প্রকল্প চালুর পর দুই বছর ধরে একটি যৌথ সমীক্ষা চালানো হবে। এই সমীক্ষার উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবে বাণিজ্যিকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কতটা লাভজনক তা নির্ধারণ করা। যদি সমীক্ষায় এটি ইতিবাচক প্রমাণিত হয়, তবে মার্কিন কোম্পানিগুলো এক গোপনীয় ‘ব্ল্যাক বক্স’ কাঠামোর অধীনে সেখানে সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করবে, যাতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে মূল প্রযুক্তি স্থানান্তরিত না হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক কৌশলের এক বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন। সাবেক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ রবার্ট এনহর্নের মতে, এই চুক্তি আমেরিকার পারমাণবিক শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সম্পর্কও হবে আরও গভীর। একই সঙ্গে এটি সৌদি পারমাণবিক খাতে রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য আধিপত্য ভেস্তে দেবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের যুক্তি, ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকলে পারমাণবিক জ্বালানি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারে বাধা দেওয়া সহজ হবে।

অন্যদিকে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাদের এই পারমাণবিক উদ্যোগ সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য। দেশটি তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে চায়, যাতে তাদের অপরিশোধিত তেল বেশি পরিমাণে বিদেশে রপ্তানি করে রাজস্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। তবে এই শান্তিপূর্ণ দাবির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০১৮ সালের সেই সতর্কবার্তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। যুবরাজ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও ঠিক একই পথ অনুসরণ করবে।

এই চুক্তি সামনে আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অসংযোজন বিশেষজ্ঞরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। সংস্থাসমূহের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদি আরব তথাকথিত ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ মানতে সম্মত হয়নি, যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণ চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া রিয়াদ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত পরিদর্শনের অনুমতি সংক্রান্ত ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ গ্রহণেও অনীহা প্রকাশ করেছে। অসংযোজন নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেনরি সোকোলস্কি সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোকেও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় নামতে উৎসাহিত করবে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি পূর্বসূরি বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। জো বাইডেন পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিনিময়ে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর সেই আলোচনা থমকে যায়। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিতে উৎসাহিত করলেও, ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের শর্ত ছাড়াই রিয়াদকে আমেরিকান পারমাণবিক প্রযুক্তি ক্রয়ের অনুমতি দিচ্ছেন।

একদিকে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া ও সামরিক হামলা চালানো, আর অন্যদিকে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া নিয়ে ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। তবে এই চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে পেশ করা হলে সেখানেও তুমুল বিরোধিতার মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের অনেক আইনপ্রণেতাই মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তির প্রসার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভেটো ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে এই চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করতে হলে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে, যা আইনপ্রণেতাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: আল মায়াদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights