ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ায় কালোমাথা কাস্তেচরা পাখি
নজরুল মৃধা, রংপুর
প্রকৃতির বিশাল ভুবনে কেউ একাকী পথচলা পছন্দ করে, আবার কেউ দলবদ্ধ জীবনে খুঁজে পায় নিরাপত্তা ও স্বস্তি। মানুষের মতো প্রাণিজগতেও রয়েছে এমন বৈচিত্র্য। সেই দলবদ্ধ জীবনযাপনের অনন্য উদাহরণ কালোমাথা কাস্তেচরা পাখি।
বাংলাদেশের জলাভূমিতে খুব বেশি দেখা না মিললেও এরা একসঙ্গে বিচরণ করতে ভালোবাসে। এমনকি প্রয়োজন হলে অন্য প্রজাতির পাখির সঙ্গেও মিশে যায়।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে দলবদ্ধ কালোমাথা কাস্তেচরার দেখা মিলেছে। বিরল এই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করেছেন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী, কবি ও লেখক রানা মাসুদ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একসঙ্গে কয়েকটি পাখির ছবি তুলতে পেরে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন।
কালোমাথা কাস্তেচরার বৈজ্ঞানিক নাম থ্রেস্কিওর্নিস মেলানোসেফালাস। এটি কাস্তেচরা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বড় আকারের জলচর পাখি। এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ ‘কৃষ্ণমস্তক পবিত্রপক্ষী’। এ কারণেই অনেকেই একে ‘ধার্মিক পাখি’ বলেও উল্লেখ করেন।
বিশ্বজুড়ে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এই প্রজাতিকে প্রায় বিপদগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনেও এটি সংরক্ষিত। পাখিবিদদের ধারণা, বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র ১০ থেকে ২০ হাজার কালোমাথা কাস্তেচরা টিকে আছে।
মিঠাপানি ও লোনাপানি-উভয় পরিবেশেই এরা স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে। সাধারণত কাদা ও অগভীর পানিতে লম্বা বাঁকানো ঠোঁট ডুবিয়ে খাবার খুঁজে বেড়ায়। মাঠে গরু, ছাগল কিংবা অন্যান্য প্রাণির চলাচলে বেরিয়ে আসা পোকামাকড়ও এদের প্রিয় খাদ্যের তালিকায় রয়েছে।
দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এই পাখির দেহের বেশিরভাগ অংশ সাদা হলেও মাথা, গলা ও ঘাড় সম্পূর্ণ কালো এবং পালকহীন। লম্বা কালো ঠোঁটটি নিচের দিকে কাস্তের মতো বাঁকানো, যা থেকেই এসেছে এর নাম। পূর্ণবয়স্ক পাখির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। চোখ লালচে, পা কুচকুচে কালো এবং বুকে হালকা হলুদ আভা দেখা যায়।
পুরুষ ও স্ত্রী পাখির মধ্যে বাহ্যিক পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও ঘাড়ের নিচের অংশে কোমল কালো পালক থাকে। প্রজনন মৌসুমে এদের মাথায় নীলাভ আভা এবং ডানার নিচে লালচে পট্টি দেখা যায়, যা তাদের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে বৈচিত্র্য। মাছ, ব্যাঙ, শামুক, কেঁচো, পোকামাকড় এবং নরম জলজ উদ্ভিদ এদের প্রধান খাদ্য। উড়ার সময় এরা বকের মতো গলা ভাঁজ করে না। শীতকালে সাধারণত নীরব থাকলেও গ্রীষ্মে বাসার কাছে শূকরের মতো কর্কশ স্বরে ডাকতে শোনা যায়।
খাবারের সন্ধানে এরা প্রায়ই স্থান পরিবর্তন করে। তাই অনেক পাখিবিদ কালোমাথা কাস্তেচরাকে যাযাবর স্বভাবের পাখি বলে মনে করেন। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এদের প্রজনন মৌসুম। ছোট মাচার মতো বাসায় স্ত্রী পাখি দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে। ২৩ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয় এবং প্রায় ৪০ দিন বয়স না হওয়া পর্যন্ত তারা উড়তে পারে না।
কালোমাথা কাস্তেচরা পাখির আলোকচিত্রী রানা মাসুদ বলেন, “খাদ্য ও আবাসস্থল সংকটের কারণে কালোমাথা কাস্তেচরা এখন আর সহজে চোখে পড়ে না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দলবদ্ধ এই পাখিগুলোর ছবি তুলতে পেরেছি, যা আমার কাছে অসাধারণ এক প্রাপ্তি।”
তিনি মীর্জা গালিবের একটি পঙ্ক্তি তুলে ধরেন-‘নির্দিষ্ট সময়ের আগে কিছুই হয় না, অতএব অপেক্ষার কোনো বিকল্প নেই।’ সত্যিই, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে অপেক্ষা করতে জানতে হয়।”
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণিরই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই বিরল এই কালোমাথা কাস্তেচরাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন জলাভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে আরও কার্যকর উদ্যোগ। তা না হলে একদিন হয়তো দলবদ্ধভাবে উড়ে বেড়ানো এই পাখিটি শুধুই স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেবে।
