ওষুধ স্প্রেম্যানের অর্ধেকই মাঠে নেই

হাসান ইমন

রাজধানীতে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত্র হয়ে মৃতের সংখ্যাও। একই অবস্থা রাজধানীর বাইরেও। কারণ হিসেবে জানা গেছে, প্রতি ওয়ার্ডে মশার ওষুধ ¯েপ্রম্যান হিসেবে কাজ করেন ১৩ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মাঠে নেই। একই সঙ্গে করপোরেশনের নিয়মিত চিরুনি অভিযান না থাকা এবং কর্মকর্তাদের তদারকির অভাবের অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

প্রতি বছরই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের নাকানিচুবানি খাওয়ায় ডেঙ্গুর বাহক ছোট্ট মশা। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক হয় যে, সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর চাপে ‘তিল ঠাঁই’ হয় না। বিগত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে ডেঙ্গুতে কত যে প্রাণ গেছে, তবু কোনোভাবেই এর ভয়াবহতা রুখতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর ওপর ?এ বছর ঢাকার দুই সিটিতে নেই কোনো মেয়র ও কাউন্সিলর। সিটি করপোরেশন পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ দিলেও এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে মশক নিধন কার্যক্রম।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতি ওয়ার্ডে মশার ওষুধ ¯েপ্রম্যান হিসেবে কাজ করেন ১৩ জন। এর মধ্যে সকালে লার্ভিসাইডিং করেন সাতজন ও বিকালে ফগিং করেন ছয়জন। এদের তদারকিতে রয়েছেন একজন মশক সুপারভাইজার। এরা সবাই দৈনিক মজুরিভিত্তিক মশক কর্মী। কাজ করলে বেতন পান, না করলে নয়। অভিযোগ রয়েছে, মশক সুপারভাইজাররা ১৩ জন মশক কর্মীর জায়গায় ৭-৮ জন কর্মীকে কাজে লাগান। বাকি কর্মীদের ছুটি দিয়ে দেন। এর মধ্যে যারা ছুটি কাটিয়ে আসেন তখন অন্যদের ছুটি দিয়ে দেন সুপারভাইজাররা। এ ছাড়াও হাজিরা নিশ্চিত করতে অনেকে স্বাক্ষর করে চলে যান। প্রতি মাসে ওয়ার্ডপ্রতি ৫-৬ জন কর্মী অনুপস্থিত থাকেন। এসব কর্মীর সঙ্গে চুক্তি করেন সুপারভাইজার। বেতনের এক-তৃতীয়াংশ দিতে হয় তাকে। কর্মীরা সন্তুষ্ট হয়ে দিয়ে দেন। কারণ কর্মীরা বাইরে অন্য কাজ করতে পারেন। প্রতি ওয়ার্ডে মাসে ৩০-৩৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত বাণিজ্য করেন সুপারভাইজাররা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে মশক সুপারভাইজাররা এমন কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মশক কর্মী বলেন, নাটের গুরু হচ্ছেন মশক সুপারভাইজার। ওনার রুটিন অনুযায়ী কর্মীরা কাজে আসেন। অনেককে বাধ্যতামূলক ছুটি দেন। আবার অনেকে বাইরে অন্য কাজ করেন সেই জন্য ইচ্ছা করে আসেন না। না এসেও যদি বেতনের অর্ধেক টাকা পান খারাপ কী! এ ছাড়াও মশক কর্মীদের সপ্তাহে অন্তত দুই দিন লার্ভিসাইডিং ও ফগিং করার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মাসেও একবার দেখা যায় না। অনেক কর্মী করপোরেশনকে দেখানোর জন্য ১০-২০ মিনিট কাজ করে চলে যান। মশক সুপারভাইজাররা নিয়মিত মাঠে এসে তদারকি করেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। বনশ্রী জে ব্লকের বাসিন্দা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ। ডেঙ্গুর এই মৌসুমে সিটি করপোরেশনের মশক কর্মীদের দেখাই যায় না। ঠিক কবে যে দেখেছি মনে নেই। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে বসে থাকাই সমস্যা হয়ে যায়। কয়েল জ্বালিয়েও বসা যায় না। করপোরেশনের এই অবহেলার কারণে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। কর্মকর্তাদের তদারকি অবহেলায় অন্যতম কারণ। আরও জানা গেছে, আগস্ট মাসে গণ আন্দোলনের সময় সহিংসতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২৫টি ওয়ার্ডের ডেঙ্গু মশা ছিটানোর যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত বা চুরি হয় বলে ওই সিটির সূত্র জানায়। আর উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫টি ওয়ার্ডের ডেঙ্গুর সরঞ্জাম কমবেশি নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। মশক সুপারভাইজার সরাসরি তদারকি করছেন। একই সঙ্গে নগরভবনে স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে অনলাইনে তদারকি করছে। এর বাইরেও অনেক কর্মী অনুপস্থিত থাকেন সেটা আমি অস্বীকার করব না। মশক কর্মীদের মধ্যে খারাপ লোক আছে। সুতরাং আমরা চেষ্টা করছি শতভাগ উপস্থিত রাখার জন্য। তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের আগে-পরে আমাদের কিছু যন্ত্রপাতি নষ্ট ও চুরি হয়ে গেছে। তবে আমাদের অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি থাকায় সেটা দিয়ে রিকভারি করা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights