কচুরিপানা এখন আর ফেলনা নয়, সম্পদ

নজরুল মৃধা, রংপুর

অনেকটা অর্কিড ফুলের মতো দেখতে কচুরিপানা। একসময় যাকে জলাশয়ের ‘আপদ’ হিসেবে দেখা হতো, সেই কচুরিপানা এখন হয়ে উঠছে জীবিকা ও সম্ভাবনার উৎস।

ইতিহাস বলছে, ব্রাজিলের এক পর্যটক ১৮ শতকের শেষ ভাগে বাংলায় কচুরিপানা নিয়ে আসেন। এরপর এত দ্রুত বাংলাদেশের প্রতিটি জলাশয়ে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে অনেকে কচুরিপানাকে আপদ ভাবতেন। কিন্তু রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দের খোর্দ্দ মুরাদপুর গ্রামে রোকেয়ার জন্মভিটাসংলগ্ন বেগম রোকেয়া স্মৃতি হস্তশিল্পের শোরুমে গিয়ে দেখা যায়, কচুরিপানার ডাঁটা থেকে তৈরি করা হয়েছে নানান ধরন ও আকারের মোড়া, ফুলের টব, ফলঝুরি ইত্যাদি। আকারভেদে কোনোটির মূল্য ১৫০, কোনোটির ৩৫০ টাকা। কচুরিপানা থেকে সবচেয়ে মূল্যবান ৫৫০ টাকারও তৈরি সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। রোকেয়ার জন্মভিটা দেখতে আসা অনেক দর্শনার্থী স্মারক হিসেবে এসব কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান সেখানকার কর্ণধার মোসাম্মৎ পারভীন বেগম। তিনি জানান, অনেক বেকার তরুণ এবং হতদরিদ্র নারী এসব তৈরি করে নিজেদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করছেন।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং বাংলা একাডেমি পরিচালিত বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমির সহপরিচালক কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না জানান, কচুরিপানার ফুল, পাতা, শিকড়ের বহুবিধ ব্যবহার রয়েছে। পানি পরিশুদ্ধ করতে এ জলজ উদ্ভিদটি বেশ উপকারী।

তিনি আরও জানান, এশিয়া মহাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলের খাবারের মেনুতে ব্যাপকভাবে স্থান করে নিয়েছে কচুরিপানা। অনেকেই সিদ্ধ করে নানান পদ রান্না করে খাচ্ছেন। এ ছাড়া ভাসমান সবজি চাষ, মাছের খাবার, জৈব সার, গবাদি পশুর খাবার, রাস্তার গর্ত ভরাট করা, পিচ ঢালাইয়ের নতুন রাস্তায় পানি দেওয়ার ও পিচ মজবুত করার জন্য, সিমেন্টের খুঁটি মজবুত করা ও পানি ধরে রাখার জন্য কচুরিপানার ব্যবহার হচ্ছে। স্বাস্থ্য, ত্বক ও চুলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও আছে কচুরিপানায়। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, একজিমা সারায়, চুল পরিষ্কার, ঝলমলে ও কোমল ভাব আনে। এ ছাড়া দাঁত ও গলাব্যথা কমানো, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, মাতৃদুগ্ধ বাড়ানো, অনিয়ন্ত্রিত ঋতুস্রাবের সমস্যা সমাধান, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও রক্তক্ষরণ বন্ধে ভূমিকা রাখে কচুরিপানা।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, কচুরিপানার কাণ্ড শুকিয়ে ব্যাগ, মাদুর ও বিভিন্ন শৌখিন পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। একসময় যে উদ্ভিদটিকে ফেলনা হিসেবে মনে করা হতো, সেটি এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights