কমছে পানি, উন্মোচিত হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন
রেজা মুজাম্মেল ও আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার পানি আস্তে আস্তে নামতে শুরু করেছে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হচ্ছে জনপদের ক্ষতবিক্ষত দৃশ্য।
গত রবিবার রাত থেকে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল নগরের অধিকাংশ এলাকায়। বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে থাকে। গতকাল আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি হয়নি। ফলে নগরের বেশির ভাগ জলাবদ্ধ এলাকা থেকে পানি নেমে যায়। এরপর ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে জলাবদ্ধতার ক্ষতচিহ্ন। দেখা গেছে, নষ্ট হয়েছে বাসার আসবাবপত্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নানা পণ্য। সড়কে ভেসে উঠছে ক্ষত আর ক্ষত। নগরের সড়ক-উপসড়কগুলোর ক্ষতবিক্ষত দৃশ্য বেশি। যদিও অনেক পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
এদিকে গতকাল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ নগরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পানিবন্দি মানুষের খোঁজখবর নিতে চান্দগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা চান্দগাঁও হাজিরপুল, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, বালুরটাল, অনন্যা আবাসিক এবং শমসেরপাড়াসহ বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে তারা কোথায় কী কারণে পানি আটকে আছে, পানি নিষ্কাশনে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে এবং দ্রুত সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন- সে বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত গ্রহণ করেন। পরে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে কিছু নিচু এলাকায় এখনো পানি জমে আছে। এসব এলাকায় কেন পানি দ্রুত নামছে না- তা স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, সবার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
মানবিক বিপর্যয় : নগরের জলাবদ্ধতা কিছুটা কমলেও উপজেলাগুলোয় চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সাঙ্গু, ডলু, ফেনী, হালদা নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে লোকালয়ে বইছে স্রোত। ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধসে গত তিন দিনে নারী-শিশুসহ আটজনের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের গৃহপালিত পশু, পুকুরের মাছ, খামার ভেসে গেছে পানিতে। স্থগিত করা হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যাকবলিত মানুষকে উদ্ধার ও খাবার পৌঁছে দিতে স্পিডবোটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। আরও বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত আছে। দুর্গতদের সেখানে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঢলে ভেসে গেল দুই শিশু : বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে পাহাড়ি ঢলে মিরাজ (৫) ও আশিক (৬) নামে দুই শিশু পাহাড়ি ঢলে ভেসে গেছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পৃথক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে আশিক ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের কামাল উদ্দিনের ছেলে। মিরাজ রত্নপুর এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে।
স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা : বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সব জেলার আজকের (শনিবার) এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ডের আওতাধীন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি (বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈদয় আক্তারুজ্জামান এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।
