কর্মের মাধ্যমে আজীবন বেঁচে থাকবেন কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ আব্দুস সাদেক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানুষ বেঁচে থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়। কিন্তু তার কর্ম বেঁচে থাকে সারা জনম। কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ আব্দুস সাদেক তার কর্মে মানুষের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন। আব্দুস সাদেক ছিলেন নির্লোভ, নিরঅহংকারী মানুষ। একজন ভাল মানুষের উদাহরণ ছিলেন তিনি। তার আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব ছিল অতুলনীয়।

শুক্রবার বিকালে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি হকি খেলোয়ার আব্দুস সাদেক স্মরণে আয়োজিত স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলে এসব কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর সরকারি আরমানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয় হলরুমে ‌‘দ্যা আরমানিটোলিয়ান ক্লাব’ এর আয়োজন করে।

আব্দুস সাদেকের স্মরণ সভায় তার জীবন ও কর্ম নিয়ে কথা বলেন দেশের কৃতি খেলোয়াড় ও আরমানিটোলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীরা।

জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত হকি খেলোয়ার প্রতাপ শঙ্কর হাজরা বলেন, চতুর্থ শ্রেণি থেকে তাকে আমি স্কুলে পেয়েছিলাম। আমার ছোট ভাইয়ের সহপাঠি ছিল সাদেক। সাদেকের সঙ্গে আমার হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন সাদেক। তার মতো ভাল হকি খেলোয়ারের নাম ক্রীড়াজগতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

সাবেক জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক মামুনুর রশীদ বলেন, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সাদা মনের মানুষ ছিলেন সাদেক ভাই। তার সঙ্গে দুই দফায় আমার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তার ভিশন হকিতে লালন করতে পারলে ক্রীড়া ক্ষেত্রে আমরা নিঃসন্দেহে লাভবান হবো।

জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত হকি খেলোয়ার নুরুল ইসলাম বলেন, আব্দুস সাদেকের জীবনে ইতিবাচক ছাড়া নেতিবাচক কিছু নেই। তার সঙ্গে আমার খেলাধুলা করার সুযোগ হয়েছে। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত সাদেক ভাইয়ের মতো ভালো খেলোয়ার কাউকে দেখিনি। তিনি ছিলেন অতুলনীয়।

স্কুলের ১৯৭৩ ব্যাচের ইউসুফ আলী বলেন, আব্দুস সাদেক ছিলেন অনুসরণ করার মতো একজন আদর্শ ব্যক্তি। তিনি আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অনেক করেছেন, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারিনি তার জন্য। তিনি সব ভালোর সঙ্গে ছিলেন।

১৯৬৩ ব্যাচের আব্দুস সালাম বলেন, আমরা একই ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলাম। সাদেক আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কীর্তি ভোলার নয়। সবসময় তার মুখে হাসি লেগে থাকত। মহান আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন।

পরিবারের পক্ষে আব্দুস সাদেকের পুত্র, টি-স্পোর্টস এর সিইও ইশতিয়াক সাদেক ও জিসান সাদেক স্মরণ সভায় অংশ নেন।

ইশতিয়াক সাদেক বক্তব্যে বলেন, আমি দেখেছি বাবার কাছে যদি কখনো হকি খেলা সংক্রান্ত কোনো ফোন আসতো তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যেত। বাবা বড় খেলোয়াড় হয়েছেন, বড় মানুষ হয়েছেন এই আরমানিটোলা সরকারি স্কুলের জন্য। আমরা ভবিষ্যতে এই স্কুলের পাশে থাকার চেষ্টা করব। আমরা বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

জিসান সাদেক বলেন, আমার বাবা যখনই আরমানিটোলা স্কুল বা হকি নিয়ে কথা বলতেন তিনি নস্টালজিক হয়ে যেতেন। এমন স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিল আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।

স্মরণ সভা থেকে ইশতিয়াক সাদেক ও জিসান সাদেকের হাতে একটি সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

দোয়া মাহফিলে আরও বক্তব্য দেন হকি দলের সাবেক গোলরক্ষক মাজিদ হোসেন, আরমানিটোলা স্কুলের ১৯৭২ ব্যাচের সিদ্দিকুর রহমান, ১৯৮৮ ব্যাচের আতিকুল ইসলাম প্রমুখ।

১৯৮৮ ব্যাচের আরিফ বিল্লাহ অনুষ্ঠানের দোয়া মোনাজাত করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রফিকুল ইসলাম কামাল ও মানিক হোসেন।

উল্লেখ্য, আব্দুস সাদেক বাংলাদেশ হকি দলের প্রথম অধিনায়ক। শুধু হকিতেই নয়, ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় সমানভাবে পারদর্শী ও দক্ষ ছিলেন তিনি। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের (ঢাকা আবাহনী লিমিটেড) প্রথম ফুটবল অধিনায়কও ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তার অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হন।

১৯৪৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন আব্দুস সাদেক। গত ২০ জুন কিংবদন্তি এ ক্রীড়াবিদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। আব্দুস সাদেক ছিলেন আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৬২ ব্যাচের ছাত্র। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights