কলকাতার নিউমার্কেট সেই তিমিরেই, পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে জানেন না কেউ

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই আছে কলকাতার নিউমার্কেট। একের পর এক আবাসিক হোটেল এখনো তালাবদ্ধ। পরিসংখ্যান বলছে, নিউমার্কেট ও মধ্য কলকাতা মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালায় তালা ঝুলছে। এতে আনুমানিক ৩ থেকে ৪ হাজার হোটেল কক্ষের সংকট তৈরি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলগুলোর নাজুক পরিস্থিতির খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নিউমার্কেটের ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে নিউমার্কেটকেন্দ্রিক অর্থনীতি। কিন্তু পর্যাপ্ত হোটেল না থাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকেই নিউমার্কেট এড়িয়ে কলকাতার অন্য এলাকায় থাকছেন। কেউ কেউ কয়েক কিলোমিটার দূরের ‘হাসপাতাল পাড়া’ হিসেবে পরিচিত মুকুন্দপুর এলাকার বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন।

তবে সেখানেও সমস্যা রয়েছে। এই সুযোগে কিছু হোটেল ব্যবসায়ী পর্যটকদের কাছ থেকে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উপায় না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই থাকতে হচ্ছে অনেককে।

গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেয় ভারত সরকার। তবে এরপরও পর্যটন ভিসায় কলকাতায় আসা মানুষের তুলনায় চিকিৎসা ভিসায় আসা বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি। ফলে তাঁদের ভোগান্তিও বেশি। রোগীকে সঙ্গে নিয়ে এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ঘুরতে হচ্ছে অনেককে।

গত বুধবার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন সাভারের বাসিন্দা খায়রুল ইসলাম। রাত একটা পর্যন্ত ঘোরার পর অবশেষে একটি হোটেল পান তিনি। থাকার জায়গা পেলেও মানসিক স্বস্তি পাননি বলে জানান এই পর্যটক।

শুক্রবার নিউমার্কেটে দাঁড়িয়ে খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে একটা হোটেল পেয়েছি। কিন্তু সেটা নিউমার্কেট থেকে অনেক ভিতরে। খাওয়াদাওয়ারও সমস্যা।’

সব মিলিয়ে কলকাতা সফরে নতুন এক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরবেন খায়রুল।

বাংলাদেশি পর্যটক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে নিউমার্কেটের কেনাবেচাতেও। যদিও স্থানীয় পর্যটক ও ক্রেতাদের কারণে সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ হচ্ছে। নিউমার্কেটের পরিচিত পোশাকের দোকান ‘মিলন’-এর এক কর্মী আশীষ কুমার বলেন, ‘এই এলাকার কিছু হোটেল বন্ধ, কিছু খোলা রয়েছে। তবে বাংলাদেশি পর্যটকেরা আসছেন, কেনাবেচাও মোটামুটি হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের এখানে স্থানীয় মানুষজনও কেনাকাটা করতে আসেন।’

কলকাতার বাসিন্দা সুমিত বেজ চিকিৎসা পর্যটনসংশ্লিষ্ট পেশায় রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা রোগীদের তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।

সুমিত বেজ বলেন, ‘বাংলাদেশি পর্যটকেরা এখানে আসেন, কয়েক দিন থাকেন। এরপর টিকিট কেটে হয়তো চেন্নাই বা হায়দরাবাদের মতো অন্য রাজ্যে চিকিৎসা করাতে চলে যান। কিন্তু মূল ভিতটাই (নিউমার্কেট) যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে খুব আশঙ্কার বিষয়। একটা দুর্ঘটনা হয়তো ঘটেছে। কিন্তু যেভাবে হোটেলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং পর্যটকেরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ছেন, এটা খুবই খারাপ বিষয়।’

তিনি বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালা রয়েছে। ‘একটা সংক্ষিপ্ত নোটিশে হোটেল কর্তৃপক্ষ যদি বলে আমরা পর্যটক নেব না, তাহলে তারা যাবে কোথায়?’—প্রশ্ন তার।

সরকারের প্রতি তার পরামর্শ, যেসব হোটেলে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা পূর্ণমাত্রায় রয়েছে, সেগুলোকে হোটেল পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হোক।

শুধু বাংলাদেশি পর্যটকেরাই নন, হোটেল বন্ধের সমস্যায় পড়েছেন ভারতের স্থানীয় বাসিন্দারাও। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা সৈয়দ ইস্তিয়াক আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বাতের সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বর্তমানে বাড়ির বাইরে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় রয়েছেন। তবে হোটেলে নয়, বন্ধুর বাসায় অবস্থান করছেন তিনি।

নিউমার্কেটে দাঁড়িয়ে সৈয়দ ইস্তিয়াক আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশিদের অন্যতম পছন্দের জায়গা নিউমার্কেট। কিন্তু স্থানীয় হোটেলগুলো বন্ধ থাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকেই নিউমার্কেটের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সেখান থেকে আবার নিউমার্কেটে আসতে যাতায়াতে প্রায় এক হাজার রুপি খরচ হয়। তাছাড়া হোটেলের ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সরকার নিশ্চয়ই বিষয়গুলো দেখবে।’

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা রহমতুল্লা গাজী কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় রিকশা চালান। মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করেই তাঁর সংসার চলে। একসময় দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ রুপি আয় করতেন। এখন দৈনিক আয় ৩০০ রুপি, কখনো কখনো তারও কম।

রহমতুল্লা গাজী বলেন, হোটেল বন্ধ থাকায় পর্যটক কমে গেছে, ফলে তাদের আয়ও কমেছে। তবে পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights