কাগজে কলমে কাজ শেষ মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, সেচসংকট-এ চার সমস্যার সঙ্গে বছরের পর বছর লড়ছে রাজশাহী। এসব সংকট মোকাবিলায় সরকার জেলার ১৬টি খাল পুনঃখনন করেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। কাগজে কলমে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক হলেও মাঠের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে শুধু খাল খনন করলেই হবে না, সঙ্গে নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন, দখলমুক্ত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পেও কাক্সিক্ষত সুফল আসবে না।

রাজশাহীর পবা, চারঘাট, পুঠিয়া, বাঘা, বাগমারা, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর উপজেলায় খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। বরাদ্দ না পাওয়ায় দুর্গাপুর উপজেলায় খাল পুনঃখনন করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে চারঘাটে ঝাউবোনা-কান্দ্র-বড়াল সংযোগ খালের ১০.৪ কিলোমিটার, পবার বৈরাগীর খালের ৩ কিলোমিটার, পুঠিয়ার নন্দনপুর-বিলকান্তা হোজা খালের ৫.৩৮৯ কিলোমিটার, বাগমারার ঝিকরা ও শুভডাঙ্গা ইউনিয়নে ১৪ কিলোমিটার এবং তানোরে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে খাল পুনরুজ্জীবনের বিকল্প নেই। কিন্তু অনেক খাল বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। কোথাও কোথাও পুনঃখননের পরও সংযোগমুখ বন্ধ থাকায় পানি চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে না। পবা উপজেলার কৃষক মুনতাজ আলী বলেন, ‘বৈরাগীর খালটি পুনঃখনন হওয়ায় ফসল চাষে সুবিধা হবে। আগে পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, সেখানে আবার চাষাবাদের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং আয় বাড়বে। তবে সারা বছর পানি থাকবে কি না এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’ পবা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘খাল পুনঃখনন হওয়ায় সেচসুবিধা, পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এ প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চৌধুরী সাওয়ার জাহান বলেন, ‘খাল খনন করলেই হবে না, পানি থাকার ব্যবস্থা থাকতে হবে। নদী থেকে পানি যাতে খালে যেতে পারে, সেভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে। জেলার অধিকাংশ উপজেলায় তেমন করে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।’ পরিবেশ গবেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এসব খালের পানির উৎস মূলত ওই অঞ্চলের নদীগুলো। বাস্তবতা হলো, নদীগুলো যেভাবে দখল হয়ে আছে, তাতে খালে আদৌ পানি আসবে কীভাবে সেটিই এখন প্রশ্ন। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। তা হলেই কেবল এমন উদ্যোগ সফল হতে পারে।’ জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম জানান, খাল খনন প্রকল্পের সুফল যাতে সাধারণ মানুষ পায় সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাহ যাতে থাকে, পানি ধরে রাখতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights