কালের সাক্ষী বলিহার হাউস
বাবুল আখতার রানা, নওগাঁ
আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়ায় বদলে গেছে নওগাঁ শহরের পুরোনো রূপ। একের পর এক সুউচ্চ অট্টালিকা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। তবু শতবর্ষের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বলিহার হাউস। শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এ প্রাসাদ। প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর নির্মিত এ ভবনের রয়েছে বর্ণাঢ্য নির্মাণ ইতিহাস। স্থানীয় ইতিহাসবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বলিহার রাজপরিবারের রাজা শরদিন্দু রায় দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে প্রায়ই রাঁচি, গয়া, দিঘা কিংবা দার্জিলিংয়ে হাওয়া বদলের জন্য যেতে হতো। রাজপ্রাসাদ থেকে বগুড়ার সান্তাহার জংশন হয়ে কলকাতা পর্যন্ত দীর্ঘ ভ্রমণ তাঁকে আরও ক্লান্ত করে তুলত। যাতায়াতের কষ্ট লাঘব এবং বিশ্রামের সুবিধার্থে নওগাঁ শহরে একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করেন তিনি। দুবলহাটী রাজা হরনাথ রায়ের কাছ থেকে দলিলের মাধ্যমে জমি ক্রয়ের পর ১৯২৯ সালে শুরু হয় বলিহার হাউসের নির্মাণকাজ। ভবনটির নকশা প্রণয়ন করেন টমাস নামের এক ব্রিটিশ প্রকৌশলী। তখনকার সময়ে এলাকাটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। জঙ্গল পরিষ্কার করে চুন, সুরকি ও বালুর বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নির্মাণকাজ। কলকাতা থেকে রেলপথে আনা হয় লোহার কড়ি-বর্গা, দরজা-জানালা, রেলিংসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ। স্থানীয় লেখক ফরিদুল করিম তরফদার বলেন, রাজপুরোহিত বারই গাঙ্গুলীর পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুভসূচনা হয় বলিহার হাউসের নির্মাণযাত্রা। বলিহার স্টেটের নায়েব রমণী কান্ত দাস এবং তরুণ রাজকুমার বিমলেন্দু রায়ের তত্ত্বাবধানে চলে নির্মাণকাজ। দায়িত্ব পান তৎকালীন খ্যাতিমান রাজমিস্ত্রি ও ঠিকাদার কেদারনাথ। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় ১৯৩৩ সালের প্রথম দিকে শেষ হয় ভবনটির নির্মাণকাজ। প্রাসাদটি নির্মাণের পর রাজা শরদিন্দু রায় কলকাতা থেকে সংগ্রহ করেন সে সময়ের অত্যাধুনিক নানান সামগ্রী। বিদেশি পিয়ানো, বিলিয়ার্ড টেবিল, ঝাড়বাতি, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, কার্পেট, আরামকেদারা, মূল্যবান আসবাবপত্র ও বইয়ে সাজানো হয় প্রাসাদের অভ্যন্তর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজা শরদিন্দু রায় কলকাতা যাতায়াতের সময় এ প্রাসাদে অবস্থান করতেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বলিহার রাজপরিবারের শেষ রাজা বিমলেন্দু রায় ভারতে চলে যান। এরপর ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে বলিহার হাউসেরও নতুন অধ্যায় শুরু হয়। বিভিন্ন সময়ে এটি ইপিআর কমান্ডারের কার্যালয় ও বাসভবন, স্বাধীনতার পর বিডিআর কমান্ডিং অফিসারের কার্যালয় ও বাসভবন, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং সদর সার্কেল পুলিশের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে ভবনটি জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইতিহাসবিজরিত ভবনটি পুরাকীর্তি হিসেবে আজও গেজেটভুক্ত হয়নি। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টোডিয়ান ফজলুল করিম বলেন, ‘আমরা চাই ভবনটি পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হোক। তাহলে ভবটি ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে পর্যটনমুখী করা যাবে। শতবর্ষ পেরিয়েও তার গাম্ভীর্য, স্থাপত্য সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের আবেদন ম্লান হয়নি।’
