কিছু ফুটবলারের বুটের গোড়ালির অংশ কাটা থাকার রহস্য কী?

ফুটবল বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়েও দর্শকদের আগ্রহ থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে ফুটবল বুট। সম্প্রতি স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে পর্তুগালের উইঙ্গার পেদ্রো নেতোকে বিশেষ ধরনের কাটা গোড়ালির বুট পরে খেলতে দেখা যায়। প্রায় ৩০০ পাউন্ড মূল্যের বুটে এমন পরিবর্তন দেখে অনেকের ধারণা ছিল, এটি হয়তো নতুন কোনো স্টাইল বা ফ্যাশন। তবে বাস্তব কারণটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

ম্যাচে নেতোর বুটের পেছনের অংশ কাটা থাকায় তার মোজা বাইরে বেরিয়ে থাকতে দেখা যায়। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই জানতে চান, কেন একজন পেশাদার ফুটবলার এমন পরিবর্তন করে বুট ব্যবহার করবেন?

শুধু পেদ্রো নেতো নন, এর আগে ব্রাজিলের ফিলিপে কুতিনহো, রবার্তো ফিরমিনো, জার্মানির ম্যাটস হামেলস এবং ইতালির দানিয়েলে দে রসির মতো তারকাদেরও পরিবর্তিত বুট পরে খেলতে দেখা গেছে। চলতি বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা ও কাইল ওয়াকারকে একই ধরনের বুট ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটি হতে পারে কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ফুটবলার গোড়ালির পেছনের অংশে চাপ কমানোর জন্য বুটের হিল অংশে পরিবর্তন করেন। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটি।

এটি এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যেখানে গোড়ালির পেছনের হাড় স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বড় হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত হাড় অ্যাকিলিস টেনডনের কাছাকাছি অবস্থান করায় শক্ত বা আঁটসাঁট বুট পরলে সেখানে চাপ ও ঘর্ষণ তৈরি হয়। এর ফলে ব্যথা, প্রদাহ এবং অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

ফিজিওথেরাপিস্ট মাইকেল রবসনের মতে, অনেক মানুষের গোড়ালিতে এই ধরনের হাড়ের বৃদ্ধি থাকলেও সব সময় সমস্যা দেখা যায় না। তবে দীর্ঘ সময় চাপ পড়লে আশপাশের টিস্যু, অ্যাকিলিস টেনডন ও রেট্রোক্যালকেনিয়াল বার্সায় প্রদাহ তৈরি হতে পারে।

ফিফার মেডিক্যাল সেন্টার অব এক্সেলেন্সের সঙ্গে কাজ করা ফিজিওথেরাপিস্ট বার্থোলোমিউ হাডসন-গিল জানান, হাড়ের গঠন, অ্যাকিলিস টেনডনের পরিবর্তন এবং বার্সার প্রদাহ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটির উপসর্গ তৈরি করতে পারে।

বুটে পরিবর্তন এনে ব্যথা কমানোর চেষ্টা

এই ধরনের সমস্যায় ভোগা খেলোয়াড়রা অনেক সময় বুটের পেছনের শক্ত অংশ বা হিল কাউন্টার কেটে দেন। এতে গোড়ালির ওপর চাপ কমে এবং অতিরিক্ত বেরিয়ে থাকা হাড়ের অংশে কিছুটা জায়গা তৈরি হয়। ফলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলতে সুবিধা হয়।

তবে পেদ্রো নেতো নিজে প্রকাশ্যে জানাননি যে তিনি হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটিতে ভুগছেন কি না। এছাড়া তিনি নিজেই বুট কাটেন, নাকি ক্লাবের বিশেষজ্ঞরা তা পরিবর্তন করে দেন সেটিও নিশ্চিত নয়।

অনেক পেশাদার ক্লাবে খেলোয়াড়দের বুট পডিয়াট্রিস্ট ও সরঞ্জাম বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে বুটের কার্যকারিতা বজায় থাকে এবং একই সঙ্গে খেলোয়াড়ের শারীরিক সমস্যাও কমে।

চিকিৎসায় কী করা হয়?

চিকিৎসকদের মতে, হ্যাগলান্ডস ডিফর্মিটিতে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত হাড় সাধারণত পুরোপুরি দূর হয় না। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে ব্যথা ও প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা।

এক্ষেত্রে চাপ কমানো, ফিজিওথেরাপি, শকওয়েভ থেরাপি, বিশেষ ধরনের ইনজেকশন এবং উপযোগী জুতা বা বুট ব্যবহার করা হয়। এসব পদ্ধতিতে কাজ না হলে কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।

১৯২৭ সালে সুইডিশ সার্জন প্যাট্রিক হ্যাগলান্ড প্রথম এই সমস্যার বর্ণনা দেন। প্রায় এক শতাব্দী পরও পেশাদার ফুটবলে এটি পরিচিত একটি সমস্যা।

তাই মাঠে কোনো ফুটবলারের বুটের গোড়ালি কাটা দেখলে সেটিকে শুধু ফ্যাশন ভাবার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে থাকে ব্যথা কমিয়ে মাঠে নিজের সেরা পারফরম্যান্স ধরে রাখার চেষ্টা।

সূত্র: ওয়াইর্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights