কিমকে কাছে টেনে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপদ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?
অনলাইন ডেস্ক
উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফের কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা জোরদার করার প্রয়াস দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এক বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করেছে। দুই দেশের যৌথ বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নির্ধারিত সময়ের আগেই হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা এবং যৌথ বাহিনীর অতিরিক্ত ১১টি মিত্র দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সুবিশাল মহড়াটি মাত্র অর্ধেকাংশ শেষ হতেই স্থগিত করে দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের তরফ থেকে আকস্মিকভাবে সামরিক উপস্থিতি ও বাজেট কমানোর এই নির্দেশে সিউলসহ এশিয়ার অন্যান্য মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই হঠাৎ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা। ট্রাম্প পেন্টাগন বা প্রতিরক্ষা দপ্তরকে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে চলতি মহড়ার পরিধি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস’ করার আদেশ দেন। এই প্রশিক্ষণকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি উসকানিমূলক, অহেতুক ব্যয়বহুল এবং কূটনৈতিক পরিবেশ বিনষ্টকারী হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, চলতি বছরের শেষের দিকে কিম জং উনের সাথে তিনি সরাসরি সাক্ষাতে বসতে চান। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের বিরুদ্ধে সিউল সামরিক সহায়তা না দেওয়ায় ওয়াশিংটনের তরফ থেকে যে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল, সামরিক মহড়া কাটছাঁটের সিদ্ধান্তকে তার সাথেও যুক্ত করে দেখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন পরিস্থিতি সামাল দিতে একে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সিউল যে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ও হতবাক হয়েছিল তা গোপনে রাখার সুযোগ মেলেনি। সামরিক মহড়ার এই আকস্মিক ইতি টানা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এশীয় নিরাপত্তা বলয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শুধু দক্ষিণ কোরিয়া নয়, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল তাইওয়ান এবং জাপানের মতো মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার সামরিক জোটের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো এই যৌথ সামরিক মহড়া। সিউলের দৃষ্টিতে এটি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির প্রত্যক্ষ রূপক। পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে পিয়ংইয়ংকে আলোচনার টেবিলে আনতে বিভিন্ন সামরিক অনুশীলন সীমিত বা স্থগিত করা হলেও ওয়াশিংটন কর্তৃক একতরফাভাবে এই সামরিক সহযোগিতা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে চরম আস্থাহীনতার মুখে ফেলে দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন হয়তো সিউলে মোতায়েন থাকা ২৭ হাজার মার্কিন সেনার সংখ্যা হ্রাস করতে পারে অথবা সিউলকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অবস্থান মেনে নিয়ে কোনো চুক্তি সই করতে পারে।
এদিকে, সিউলের এই অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের মাঝেও কৌশলগত দিক থেকে উত্তর কোরিয়া এখন বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশটি দীর্ঘকাল ধরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে আসছে এবং নিজেদের সংবিধানে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের অধিকার যুক্ত করেছে। তাছাড়া, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সাথে সামরিক সমঝোতা বাড়িয়ে হাজার হাজার সৈন্য ও বিপুল সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে পিয়ংইয়ং, যা থেকে তারা লাভ করছে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল বা সামাজিক মাধ্যমে কিমের সাথে তাঁর সুসম্পর্কের কথা প্রচার করলেও কিম জং উনের ক্ষমতাধর বোন কিম ইয়ো জং বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যৌথ মহড়া কমানো উত্তর কোরিয়ার নীতিমালায় কোনো প্রভাব ফেলবে না এবং তারা কোনো অবস্থাতেই নিজেদের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ক্ষমতা পরিত্যাগ করবে না।
মার্কিন প্রশাসনের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপে কৌশলগত সংকট দেখা দেওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে নতুন নিরাপত্তার পথ অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী সিউলভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেজং ইনস্টিটিউটের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, সিউলকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোট বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা পারমাণবিক বোমার সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। দেশটির অধিকাংশ জনগণ নিজস্ব পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জনের পক্ষে থাকলেও এতদিন সরকার আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ও মিত্রদের সম্পর্কের কথা ভেবে সেই পথ এড়িয়ে গেছে। তবে ওয়াশিংটন যদি এশিয়া থেকে সামরিকভাবে হাত গুটিয়ে নিতে থাকে, তবে সিউলের দীর্ঘদিনের এই ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হতে বাধ্য।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মাইয়ুং অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসাই করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় তিনি ট্রাম্পের উদ্যোগকে শান্তির উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ট্রাম্পের এই অনিশ্চিত নীতি ও একের পর এক বাণিজ্যের সাথে জাতীয় সুরক্ষাকে জড়িয়ে ফেলার প্রবণতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নাটকের মাঝখানে পড়ে শেষ পর্যন্ত বড় মূল্য দিতে হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়াকেই।
বিবিসির বিশ্লেষণ
