কিলার এআই’তে নজর পেন্টাগনের, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু আছে?
অনলাইন ডেস্ক
সায়েন্স ফিকশন সিনেমার সেই ভয়ংকর ভবিষ্যৎ যেন এখন দরজায় কড়া নাড়ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নতুন বৈশ্বিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জানা যায়, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের গোপন সামরিক পরিকল্পনায় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘ক্লড’ ব্যবহার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী, এই খবর আসার পরই আলোচনা শুরু হয়। বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। অ্যানথ্রোপিকের মূলনীতি হলো তাদের তৈরি এআই কোনো ধরনের যুদ্ধ বা গণ-নজরদারির কাজে ব্যবহার করা যাবে না। এই নৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো সফটওয়্যারের ভেতরেই স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।
পেন্টাগন যখন ক্লডের এই নৈতিক বাধার মুখে পড়ে, তখন তারা বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সরাসরি দাবি করা হয় যেন তাদের জন্য এআই’র একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করা হয়, যেখানে কোনো ধরনের নৈতিক বা মানবিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই সীমাবদ্ধতার সমালোচনা করে বলেন, পেন্টাগনের এমন কোনো নিউরাল নেটওয়ার্কের প্রয়োজন নেই যা যুদ্ধ করতে পারে না। এমনকি এই নির্দেশ না মানলে অ্যানথ্রোপিককে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানও তাদের সাথে কাজ করতে পারবে না।
এই বিবাদটি কেবল আমলাতান্ত্রিক কোনো বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর দার্শনিক সংঘাত। একদিকে রয়েছে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের নেশা, আর অন্যদিকে রয়েছে মানব সভ্যতাকে এআই-এর সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা। প্রকৌশলীরা আগে থেকেই সতর্ক করে আসছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আচরণ অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অতীতে চ্যাটজিপিটি বা খোদ ক্লড-এর পরীক্ষামূলক সংস্করণে এমন সব আচরণ দেখা গেছে যেখানে তারা মানুষকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছে কিংবা ডেভেলপারদের ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছে। এখন যদি এই প্রযুক্তিকে সমস্ত নৈতিক শেকল থেকে মুক্ত করে বিধ্বংসী অস্ত্রের সাথে যুক্ত করা হয়, তবে যুদ্ধের ময়দানে জবাবদিহিতা বলে কিছু থাকবে না।
উদ্বেগের বিষয় হলো, গুগল বা ওপেনএআই’র মতো অনেক বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই সামরিক প্রয়োজনে তাদের সীমাবদ্ধতা শিথিল করতে রাজি হয়েছে। যদিও বর্তমানে এটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংকট বলে মনে হতে পারে, তবে এর প্রভাব হবে বিশ্বব্যাপী। রাশিয়া বা চীনের মতো দেশগুলোও তাদের সামরিক ড্রোন এবং নজরদারি ব্যবস্থায় এআই যুক্ত করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ বা হামলা চালানোর ক্ষমতা পাবে, তখন কোনো ভুল বা যুদ্ধাপরাধের দায়ভার নেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। পেন্টাগন এবং অ্যানথ্রোপিকের এই লড়াই বিশ্বকে এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, মারণাস্ত্রবাহী এআই আর কোনো কাল্পনিক গল্প নয় বরং এক রূঢ় বাস্তব যা বর্তমান বিশ্বের নৈতিক ও মানবিক অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
সূত্র: আরটি
