কুমিল্লার শিক্ষকের ঘরে আইনস্টাইন-ওয়াশিংটনের ‌আড্ডা!

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

কাঁঠ, বাঁশ, লোহা, সোনা, পাথর, মাটি বা বালুর ভাস্কর্যের কথা শুনেছেন। চকে ভাস্কর্য গড়ে তোলার কথা নিশ্চয়ই শোনেননি। চককে কেউ খড়িমাটিও বলেন। শিক্ষকরা ব্ল্যাকবোর্ডে ও শিশুরা স্লেটে লেখার কাজে ব্যবহার করতেন। ধরার সুবিধার জন্য একটু বাকি থাকতে সেটি ফেলে দেওয়া হতো। সেই ফেলে দেওয়া চক দিয়ে বাংলাদেশে প্রথম ক্ষুদ্র ভাস্কর্য তৈরি করেছেন কুমিল্লার এক তরুণ শিক্ষক।

সেই চকের মাথায় হাসছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামসহ দুনিয়াজোড়া হাজারো খ্যাতিমান মানুষ। কাচের ঘরে ঠাঁই হয়েছে তাদের। মনে হয় সেখানে তারা আড্ডায় মেতেছেন। শিক্ষকের নাম সামিউল আলম জাহেদ। বাড়ি কুমিল্লা শহরতলির চাঁনপুরে। বাবা ব্যবসায়ী শহীদুল আলম। মা গৃহিণী রোকসানা বেগম। চার ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। সেই ভাস্কর্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কারও।

সূত্র জানায়, জাহেদ ২০০২ সালে কুমিল্লা হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ২০০৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি, একই কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। ২০১৭ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে বিএফএ ডিগ্রি এবং ২০১৯ সালে এমএফএ (প্রিন্টিং অ্যান্ড ড্রয়িং) পাস করেন। বর্তমানে চারুকলার শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কুমিল্লা আর্ট কলেজে।

আর্ট কলেজে গিয়ে দেখা যায়, কলেজের কক্ষে তার চকের যত কারবার। প্রথমে কম্পাসের কাঁটা আর সুই দিয়ে কাজ করলেও এখন বিশেষ ধরনের কাঁটা সংগ্রহ করেছেন। চকের মাথায় বিভিন্ন চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তোলেন। চকের মাথায় শেরে বাংলা, মাদার তেরেসা, লিবার্টি স্ট্যাচু, আইনস্টাইন, জর্জ ওয়াশিংটন, রবীন্দ্র ও নজরুলসহ অনেক মনীষীর দেখা মেলে। সেখানে তার পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা চকের গায়ে ভাস্কর্য তৈরি দেখছেন।

জাহেদ জানান, ফেলে দেওয়া চকে তিনি সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যানদের ফুটিয়ে তুলতেন। এরপর নতুন চকে শুরু করেন। বন্ধুদের অনেকে আড়ালে মুখ টিপে অবজ্ঞার হাসি হেসেছেন। চকে আবার ভাস্কর্য! সঙ্গে তিনি রং দিয়ে ছবি আঁকেন। গিটারে সুর তোলেন। তবে পরেরগুলো নিয়ে নিকটজনরা বাহবা দিতেন। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে চকে। টেবিলের ড্রয়ারে রাখা চকের ভাস্কর্যগুলো নেড়েচেড়ে দেখেন। কিছু পোকা খাদ্য বানিয়েছে। কিছু ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু তার মন ভাঙতে পারে না। ভাবতে থাকেন কীভাবে তার কাজগুলোকে মজবুত করা যায়। চকে ভাস্কর্য ফুটিয়ে তোলার পর তিনি সেগুলো গামে ডুবিয়ে নেন। শুকানোর পর সেগুলো শক্ত হয়ে যায়।

২০০০ সাল থেকে ২০১৭ সাল। নিজের বানানো ভাস্কর্যগুলো ড্রয়ারে ফেলে রেখেছিলেন জাহেদ। চারুকলার শিক্ষার্থী বন্ধু শাকের এসব ভাস্কর্য দেখে তাকে জানান এসব মিনিয়েচার ভাস্কর্য। এগুলো নিয়ে প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া সম্ভব। ১৭ বছর পর জাহেদ বুঝতে পারেন তিনি যা তৈরি করেছেন সেগুলো একটি শিল্প। ৭২টি মিনিয়েচার ভাস্কর্য নিয়ে অংশ নেন জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে, জিতে নেন পুরস্কার।

জাহেদ আরো বলেন, চক এখন অনেকে চেনেন না। হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাপণ্যকে বাঁচিয়ে রাখবে এই ভাস্কর্য। তিনি এই শিল্প নিয়ে যেতে চান বহুদূর। চকের গায়ে ফুটিয়ে তুলছেন বাঙালির আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। তিনি এই কাজ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান।

শিক্ষার্থী আকলিমা আক্তার ও জান্নাতুল মাওয়া বলেন, তিনি (জাহেদ) শুধু সৃজনশীল শিল্পীই নন, তিনি মেধাবী মানুষও। ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় তিনি দেশসেরা হয়েছিলেন। জটিল একটা বিষয় স্যার সহজ করে বুঝিয়ে দেন।

জাতীয় শিল্প নির্দেশক উত্তম গুহ বলেন, জাহেদ সৃজনশীল ছেলে। তার শিল্পী মন রয়েছে। তার কাজে আমি মুগ্ধ। সে আগামীতে আরও ভালো করবে বলে আমরা আশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights