কৃতজ্ঞতার রকমসকম

নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ নামে যাঁরা দুনিয়ায় পরিচিতি অর্জন করেন তাঁদের মুগ্ধকর কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। এর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য : ভুল স্বীকার করা, অন্যায় করেছেন বুঝলে মাফ চাওয়া আর উপকার পেয়েছেন যাঁর কাছ থেকে, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানো। দাম্ভিকরা ভুল স্বীকার করেন না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও না। তাঁরা কেউ কেউ ধরেই নেন যে ভুল করার জন্য আল্লাহর দুনিয়ায় তাঁরা পয়দা হননি। আবার কিছু কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাঁরা অন্যায় কী- অন্যায় কারে কয়, তা বোঝেনই না। ভয়ের ব্যাপার ঘটান এঁরা। কখন? যখন শতজনের জন্য ক্ষতিকর কাজ করেও ভাবেন ‘অন্যায়টা আবার করলাম কোথায়!’

রাজধানীর মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ১৯৮২ সালে যে পত্রিকায় কাজ করতাম, সেখানে আমার সহকর্মী শাহনূর খান। কবি মানুষ। পদবিতে শিফট-ইনচার্জ। সরলতার সুগন্ধ তাঁর আচরণে। এটা আমরা যাঁরা তাঁর সমবয়সি তাঁরা অনুভব করি। তাগড়া নওজোয়ানরা ওসব অনুভূতির ধারেকাছে নেই। তাঁদের অভিযোগ, শিফট-ইনচার্জ শাহনূর তাঁদের দিয়ে বিস্তর নিউজ আইটেম বানান, যেগুলো বানাতে বানাতে তাঁরা কাহিল হয়ে যান।

এক দুপুরে এই নওজোয়ানরা- এঁরা পদবিতে সাব এডিটর; আমাকে ঘেরাও করেন, তবে কোনো স্লোগান দেন না। না দিলেও তাঁরা যা যা বলেন তার অনুবাদ স্লোগানের ভাষার ‘মোদের দাবি মোদের দাবি/মানতে হবে মানতে হবে’র মতোই। দাবি হচ্ছে- শাহনূর ভাইয়ের শিফট থেকে আমাদের প্রত্যাহার করা হোক। সমস্যার গভীরে গিয়ে জানতে পাই, গত রাতে ক্ষুব্ধ সাব এডিটরদের দিয়ে ৬৫টি আইটেম বানানো হয়েছে কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ১৭টি। প্রতিরাতেই প্রায় এরকমই করা হয় মানে ৪৫-৫০ আইটেম, গতরাতে ওটা ‘সহ্যসীমার বাইরে’ হয়ে গেছে। প্রতিকার না পেলে ভুক্তভোগীরা কর্মবিরতি পালনের হুমকি দেন। ঘোষণা করেছেন, কলম বন্ধ করা হবে আজ সন্ধ্যায় এবং গিট্টু না খোলা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। পরিস্থিতি তপ্ত। বার্তা সম্পাদক মীর নূরুল ইসলাম আমায় বলেন, ‘প্লিজ কিছু একটা করো।’

সংলাপশাহনূরের সঙ্গে সংলাপে বসলাম। বেহুদা এত এত নিউজ আইটেম রোজ রাতে কেন করান? জবাবে তিনি বলেন, ‘তাহলে কয়টা আইটেম করাব!’ বলি, বেছে বেছে ইম্পর্টেন্ট নিউজগুলো করালেই তো পারেন। শাহনূর ডানে-বাঁয়ে সতর্ক দৃষ্টিপাত করে দেখেন, অফিস সহায়ক গিয়াস উদ্দিন অদূরে দাঁড়িয়ে কান পেতে সংলাপ শুনছে। ওকে ধমক মেরে তিনি বলেন, ‘তোর এখানে কাম কী? যা ভাগ্।’

গিয়াস ভাগে। তবে নিঃশব্দে হাসতে হাসতেই। শাহনূর স্যারের সেবায় থাকা তার কাজ। স্যার তো সপ্তাহের ছ’দিনই তার হাতে নানারকম কাম করাচ্ছেন। আজ ঝামেলায় পড়ে তাঁর মেজাজ খিচড়ে যাওয়ায় বলছেন, তোর এখানে কাম কী। উপরিতলার স্যারেরা ঝামেলায় পড়লে মজাদার কত কথাই না বলেন! এই যে তাঁদের বলা, এটাও এক নেয়ামত। মানে মাগনায় হাস্যকর জিনিস পাওয়া আর কী। এখন কোনো আলাপ করলে তা অফিস সহায়কদের কেউ শোনার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই, এরকম নিশ্চিত হয়ে শাহনূর খান বলেন, টু টেল ইউ ফ্রাংকলি, যত নিউজ আইটেম করাই আমার কাছে তার সবই ইম্পর্টেন্ট মনে হয়। ইম্পর্টেন্ট মনে করা অন্যায়?

‘মানুষকে অনর্থক খাটানো কোন ধরনের ন্যায়?’ মনে মনে বলেছি। আর মুখে বললাম, গরিষ্ঠের অভিমত বলে একটা ব্যাপার আছে। যারা নিউজ আইটেম তৈরি করেন তাদের সবাই মনে করেন আপনি যা করাচ্ছেন তা অন্যায়। শাহনূর বলেন, ‘ওয়েল! আই য়্যাম ইয়েলডিং টু দ্য উইল অব দ্য মেজরিটি। নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। শিফট অন্য কেউ চালাবেন। ব্যবস্থা নিন প্লিজ!’

ফলদায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে নওজোয়ান সাব এডিটররা বার্তা সম্পাদকের কামরায় ঢুকলে তিনি বলেন, ‘ভুল জায়গায় কৃতজ্ঞতা নয়। কৃতজ্ঞতা তো তাকেই জানানো উচিত, যে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকে মূল্য দিয়েছে। সম্মান করেছে।’

বার্তা কক্ষে সাব এডিটরদের হালকা উল্লাসধ্বনি যখন চলছিল, সে সময় আমার টেবিলে এলেন শাহনূর খান। বললেন, ‘কৃতজ্ঞতা জানাতে এলাম। যাদের ওপর মাতব্বরি চালাই- তারা ভিতরে ভিতরে আমার ওপর খুবই রেগে আছে, আপনি না জানালে তা টেরই পেতাম না। ভালো কথা। আমার জায়গায় নতুন শিফট-ইনচার্জ হচ্ছেন কে?’

‘তাঁর নাম শাহনূর খান।’ জানাই আমি, ‘বার্তা সম্পাদক পদ্ধতিগত পরিবর্তন এনেছেন। সব আইটেম তিনি যাচাইবাছাই করে ২০টি আইটেম চূড়ান্ত করবেন। সাব এডিটরদের দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলোর পরিমার্জন করিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শিফট ইনচার্জের। ইতোমধ্যে সাব এডিটররা আমাদের কাছে এসে পড়লেন। করমর্দন আর কোলাকুলির পর্ব সাঙ্গ হলে শাহনূর বলেন, ‘পুরোপুরি যে আমায় বর্জন করলে না, সেজন্য তোমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই।’ সাব এডিটররা বলেন, ‘আমরাও কৃতজ্ঞ। এত কিছুর পরও আপনি আমাদের ছেড়ে যাননি। আপনি শতায়ু হোন।

২. দোয়া কবুল হয়নি। শাহনূরের জীবনটা দীর্ঘ হতে দেয়নি তাঁর হৃদযন্ত্র। পঞ্চাশের আগেই যন্ত্রটি থেমে গিয়েছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে করা মানহানি মামলায় হাজিরা দেওয়ার জন্য শাহনূর খান যশোর যান। রাতভর বাসযাত্রা করে ভোরবেলায় পৌঁছেন। কোর্টে পৌঁছানোর আগেই হার্ট অ্যাটাক। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ১০ ঘণ্টার মধ্যে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়েন তিনি।

শাহনূরের সঙ্গে আমার আনন্দের ঘটনা অনেক। একটি তো আমার অক্ষয় স্মৃতির অংশ। সুপণ্ডিত-সুলেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ১৯৭২ সালে পাকাপাকি ঢাকায় চলে আসেন। তাঁর মুখোমুখি হওয়ার প্রবল আগ্রহ আমার। এক সকালে সুযোগটা করে দেন শাহনূরই। সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁকে সম্বোধন করতেন ‘শাহীনূর’। আমরা জানি, ‘পৃথিবীর ১৭টি ভাষায় পারঙ্গম তিনি। জানতাম না যে বিভিন্ন জেলার ভাষাও মুজতবা আলীর কণ্ঠস্থ। আমার বাড়ি কোন জেলায় জানতে পারার পরই তিনি বলেন, ‘তুঁই আলু-ফটলের ব্যবসা কইত্তে ফাইত্তা, চাইল ডাইল ঘি ত্যালের দোকান দিলেও অনেক মুনাফা কইরতা। হেগিন না করি, জার্নালিজমে হাঁদাইলা কার বুদ্ধিতে? এই প্যাশা তো রিস্কি প্যাশা।’

মুজতবা আলীর মতে, আলু-পটোলের ব্যবসা করতে পারতাম, চাল-ডাল-ঘি-তেলের দোকান দিলেও মুনাফা হতো আমার। তাঁর জিজ্ঞাসা : সেসব না করে আমি কার বুদ্ধিতে সাংবাদিকতায় ঢুকলাম। এ পেশা তো ঝুঁকিময় পেশা।

মুগ্ধ বিস্ময়ে আমি আমার প্রিয় লেখকের দিকে তাকিয়ে রই। শাহনূর বলেন, ‘আপনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। ‘বিশ্বভারতীতে শান্তিনিকেতনে পড়িয়েছেন, সেই আপনি কোন দুঃখে ঢাকায় বাস করতে এলেন।’

‘ঢাকা এখন স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাজধানী’ বলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, ‘একটু বোঝার চেষ্টা করো শাহীনূর। নতুন রাজধানীতে নানা নমুনার মালামাল আর মানুষের প্রয়োজন। অতি উচ্চস্তরের মহামূর্খেরও অভাব চলছিল। আমি সেই অভাব পূরণ করতে এলাম।’ নিজেকে নিয়ে নিজে এরকম রসিকতা করতে তখন পর্যন্ত আমি আর কাউকে দেখিনি। পরে আরেকজনকে পাই- বিখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী। তাঁর বিষয়ে আরেক দিন লেখা যাবে।

সেই সকালে ধানমন্ডিতে মুজতবা আলীর বাড়িতে আরও তিন ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল। এঁদের একজনকে মুজতবা আলী বলেন, ‘তোতা মিয়া বলো তো দেখি! মাত্র সাড়ে ১৪ মাসে তুমি যে লাখপতি হয়ে গেলে এজন্য তুমি কার কাছে কৃতজ্ঞ?’

সাফারি স্যুট পরা তোতা মিয়া বলেন, ‘মামুজান বরকত চেয়ারম্যান আর জেনারেল ইয়াহিয়া খান, এই দুজনের মধ্যে কারে যে কৃতজ্ঞতা জানাই ভেবে পাচ্ছি না স্যার।’

জানা যায়, বিপদে পড়ে পাকিস্তানি মিলিটারির ভয়ে মামা বরকত হোসেনের বাড়িতে সপরিবারে আশ্রয় নেন তোতা। দিন সাতেকের মধ্যেই বহিষ্কৃত হন তাঁরা। মধ্য এপ্রিলে হাতে জীবন আর দেড় শ টাকা নিয়ে তোতা উঠলেন চট্টগ্রাম শহরে। জরুরি ভিত্তিতে রাস্তা মেরামতের ঠিকাদারি করে অবিশ্বাস্য গতিতে ধন অর্জন করলেন। এজন্য তাঁর মনে হয়, মামা তাঁকে দূর দূর করে উপকারই করেছেন। আবার মনে হয়, মূল উপকারটা ইয়াহিয়া খানই করেছেন। জেনারেল যদি নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যায় পটু মিলিটারি লেলিয়ে না দিতেন, তাহলে মামাবাড়ি যাওয়ার দরকারই হতো না।

৩. পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মুসলিম লীগের ক্ষয় শুরু ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গীয় আইনসভা নির্বাচনের পর। ওই নির্র্বাচনে বিরোধীদলীয় জোট যুক্তফ্রন্টের হাতে শোচনীয় পরাজয় ঘটে মুসলিম লীগের। ১৯৮২ সালে দেখা যায় দলটি চার ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগের নেতা আশরাফ উদ্দিন ছিলেন বনেদি ব্যবসায়ী। দলের ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠান হলেও পত্রিকায় তাঁর ভাষায় ‘খোলতাই’ কাভারেজ আশা করতেন এবং হতাশ হতেন। তখন বলতেন, কী আর করি ভাইসাব! সবই কপালের লিখন।

তেজগাঁও শিল্প এলাকায় একদা যে পত্রিকা অফিসে কাজ করতাম, আশরাফ উদ্দিন মাঝেমধ্যে সেখানে আসতেন। কিছুক্ষণ গল্প করে সবাইকে কাবাব-পরোটা খাইয়ে চলে যেতেন। সহকর্মী আকবর হোসেন একদিন বলেন, ‘অনেকেই আজকাল বলে বাঙালি জাতির উচিত মুসলিম লীগকে কৃতজ্ঞতা জানানো। তারা পাকিস্তান না গড়লে বাংলাদেশ সৃষ্টির সুযোগই আসত না। আপনি এই যুক্তি মানেন?’

‘ফালতু যুক্তি কেন মানব? আমারে কি কুত্তায় কামড়ায়?’ বলেন আশরাফ, ‘ফালতু কথারে গুরুত্ব দিলে তো মুসলিম লীগকে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে শুঁটকির কাছে।’ কোথায় মুসলিম লীগ আর কোথায় শুঁটকি! গোলমেলে লাগছিল। আশরাফ উদ্দিনের ব্যাখ্যায় ধোঁয়াশা কেটে গেল।

মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দাদা ছিলেন হিন্দু, নাম পুঞ্জালাল ঠাক্কার। বাড়ি গুজরাটের কাথিওয়াড় জেলার পানেলিগাঁও গ্রামে। শহরে তিনি শুঁটকি মাছের ব্যবসা করতেন। পুঞ্জালালের গোত্র লোহানা। এই গোত্র মনে করে- মাছ-মাংস খাওয়া বা বেচাকেনা করা ধর্মবিরোধী কাজ। তাই তারা পুঞ্জালালকে ‘ধর্মচ্যুত’ ঘোষণা করে। অগত্যা ব্যবসা বন্ধ করে তিনি গ্রামে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রামবাসী তাঁকে গ্রামে ঢুকতে দিল না। রাগে-দুঃখে পুঞ্জালাল মুসলমান হয়ে গেলেন। পুঞ্জালালের ছিল তিন ছেলে। এঁদের মধ্যে জিন্নাহভাই করাচি গিয়ে চামড়া ব্যবসায় নেমে উন্নতি করেন। কয়েক বছর পর ১৮৭৬ সালে তাঁর স্ত্রী মিঠাবাঈ ছেলে সন্তান জন্ম দিলেন। নবজাতকের নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহভাই।

লেখক : সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights