কৃষকবন্ধু জিয়াউর রহমান
প্রিন্সিপাল এম এইচ খান মঞ্জু

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ফসল হিসেবে ক্ষমতায় আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ৩ নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে রাখেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ান সিপাহি ও জনতা। তাঁরা বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। দেশ পরিচালনার মহানায়কে পরিণত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হন রাষ্ট্রপতি।
১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। সেই দুর্দিনের কথা মনে রেখে রাষ্ট্রপতি জিয়া দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দেশজুড়ে শুরু করেন খালকাটা কর্মসূচি। রাষ্ট্রপতি জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাঁর কৃষিবান্ধব পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে আর কখনো দুর্ভিক্ষ আসেনি।
কৃষি বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় এই খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবন ধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪২ দশমিক ৬২ শতাংশ কৃষি ক্ষেত্রে নিয়োজিত। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকরা এখনো সমাজে অবহেলিত। যারা খাদ্য উৎপাদন করে তারা যদি ন্যায্যমূল্য না পায় তাহলে কৃষি বাঁচবে না।
বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষিনির্ভরতার কারণেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মহামারি করোনায় দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে না পারার অন্যতম কারণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। ১৯৭১ সালের তুলনায় খাদ্য উৎপাদন প্রায় পাঁচ গুণ (৪.৭৫) বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২১ লাখ টন (অর্থবছর ২০১৮-১৯)। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ খুব সামান্যই চাল আমদানি করেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে মাত্র ০.০৪ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। জুলাই-ফেব্রুয়ারি ২০২০-২১ সময়ে বাংলাদেশ ধান-চাল রপ্তানি করে ৮৩.৭ লাখ মার্কিন ডলার আয় করে।
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে যে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়েছে, তার মধ্যে শুধু ধান ৫ কোটি ৮৬ লাখ টন। ভুট্টা ৪৭ লাখ টন। আর গম ১১ লাখ টন উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশে মোট দানাদার খাদ্য উৎপাদনে রেকর্ড। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৬ কোটি ৯ লাখ ২১ হাজার টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬ কোটি ৩১ লাখ ৩০ হাজার টন হয়েছে।
দেশে বছরে যে পরিমাণ খাদ্য আমদানি হয়, তার বড় অংশ হচ্ছে গম। এর বাইরে সামান্য চাল, ভুট্টা ও অন্যান্য খাদ্য আমদানি হয়। বিদায়ি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ৭১ লাখ টন দানাদার খাদ্য আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। খাদ্য আমদানির আর্থিক সক্ষমতা কমে আসায় এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এ নিয়ে টানা দুবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আমদানি কম হলো। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ডলার-সংকটের কারণে খাদ্য আমদানি কম হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের একটা বিশাল অংশ তাদের জীবনধারণের জন্য কৃষির ওপর নির্ভর করে। শতপ্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করছেন আমাদের কৃষকরা। কৃষিবিদরা যথাসম্ভব তাঁদের সহায়তা করছেন। আর এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আমরা জানি কৃষিতে নানা সমস্যা আছে, যার সমাধানও রয়েছে। আমরা এখনো কৃষিতে অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছি। আমাদের চাল উৎপাদন যথেষ্ট, যা ধরে রাখতে হবে। এখন চাল রপ্তানি হচ্ছে। তাপমাত্রাসহিষ্ণু গমের জাত উদ্ভাবনের ফলে গমের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এটা কৃষক ও দেশের জন্য সুখবর। অন্যান্য বার আগাম বন্যা ও নানান কারণে বোরোর ক্ষতি হয়। কৃষক কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়। এবার তা হয়নি। ধানের আবাদ-উৎপাদন ভালো হলে শুধু কৃষকের মুখে হাসি ফোটে না, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাও মজবুতি অর্জন করে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এখনো কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়নি।
এবার আগের তুলনায় ধান উৎপাদনে খরচ বেশি পড়েছে। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি খরচ গুনতে হয়েছে। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫০ টাকা। অথচ এক মণ মোটা ধান বিক্রি করে তারা পাচ্ছে মোটা ধান বড়জোর ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং সরু ধান ১ হাজার ১০০ টাকা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান উৎপাদন করার পর যদি উৎপাদন খরচ পর্যন্ত না ওঠে, তবে এর চেয়ে হতাশা ও বঞ্চনা আর কিছু হতে পারে না।
কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না। সে ধান, পাট, আখই হোক কিংবা হোক তরিতরকারি বা অন্য কিছু। পাট ও আখের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে তা খেতেই রেখে দেওয়া অথবা পুড়িয়ে ফেলার দুঃখজনক ঘটনা আমাদের দেশে ঘটেছে। টমেটো, কপি, তরমুজ ইত্যাদি ফেলে দেওয়া বা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করার কথাও আমরা জেনেছি।
কৃষক যে ফসলের উচিত মূল্য পায় না, সে ফসল উৎপাদন থেকে সরে আসে। কৃষকরা তাদের পরিবার-পরিজনের খাদ্যসংস্থানের জন্যই বাধ্য হয় ধান উৎপাদনে। তা ছাড়া দেশের কোনো কোনো এলাকায় বা জমিতে ধান ছাড়া অন্য ফসল উৎপাদন করার সুযোগ নেই। যেমন হাওর এলাকায় বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান উৎপাদন ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষক আবাদ ছেড়ে না দিলেও কমিয়ে দেয়। বিভিন্ন বছরের আবাদ-উৎপাদনের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এখন ব্যবসায়ী ও মিলারদের কাছ থেকেই মূলত সরকার ধান-চাল কেনে। এই ব্যবস্থার ফলে কৃষক নয়, ধান-চালের ব্যাপারে ব্যবসায়ী ও মিলাররাই সর্বোচ্চ প্রাধান্যে এসেছে। তারা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে সরকারনির্ধারিত দামে সরকারের কাছে বিক্রি করে। তাই হতাশ ও বঞ্চিত কৃষক ধানের আবাদ কমিয়ে দিলে ভবিষ্যতে চালের মূল্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর তার অনিবার্য বিরূপ প্রভাব পড়বে।
কৃষকদের জন্য উৎপাদিত ধান ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের মূল্য নির্ধারণ ও তার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তারা সন্তুষ্ট ও উৎসাহিত হয়। সহজে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে, গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করতে হবে। আমরা যদি কৃষকদের মূল্যায়ন করি তবেই আমরা সফল হতে পারব খাদ্যসংকট মোকাবিলায়।
তবে আশার খবর হচ্ছে, দেশের কৃষিব্যবস্থায় যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া অর্থনীতিতে বড় সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। কৃষিতে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি, ফসল সংগ্রহ-উত্তর অপচয় হ্রাস, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে শুরু করেছে কৃষক।
জলবায়ু পরিবর্তন তথা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। দেশে কম্বাইন হারভেস্টারসহ রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার ও রিপার মেশিনের ব্যবহার বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার উপযোগী ধানের চারা উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরিতে সাহায্য করছে। কৃষি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জীবনীশক্তি।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কিন্তু ভূমি খালি রেখে দেশকে রক্ষা সম্ভব নয়। তার জন্য কৃষকদের যা সহযোগিতা লাগবে সার, পানি ও বীজ তা সময়মতোই ব্যবস্থা করা হবে। কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য না খেলে আমাদের খাদ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। আর এ খাদ্য যারা উৎপাদন করছে, সেই কৃষক যেন তার ন্যায্যমূল্য পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বছরব্যাপী ফল উৎপাদন বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কলা, পেঁপে, থাই পেয়ারা, আপেল কুল চাষ বেড়েছে। আউশ ও রোপা আমন চাষে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কৃষিখামার স্থাপন, খামার যান্ত্রিকীকরণ বর্তমান কৃষিকে একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ অবস্থানে নিয়ে যাবে এমনটা আশা করা যায়। কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল হবে এমনটাই মনে করি।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য
