কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্য সেবায় আধুনিকতা

মানিক মুনতাসির

সুপারশপের স্বাচ্ছন্দ্যময় কেনাকটার সুযোগসুবিধা নগর থেকে এখন বিভাগীয় ও জেলা শহরেও বিস্তৃত; যা জীবন করেছে গতিময় ও ঝামেলাহীন। কেননা মাছ কিনতে গিয়ে মাছের গন্ধে নাক চেপে ধরা, মুরগি কিনতে গিয়ে বিষ্ঠা ও বর্জ্যরে দুর্গন্ধ এড়িয়ে চলা কিংবা সবজি কিনতে গিয়ে কাদাপানিতে পা ভেজানো-নিত্যদিনের বাজারের এমন চিত্র নগরজীবনে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। একই ছাদের নিচে মাছ, মাংস, মুরগি, সবজি, ফলমূল, চাল-ডাল, মসলা থেকে শুরু করে প্রসাধনী, শিশুপণ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রীসহ বিভিন্ন রকম তৈজসপত্রও মিলছে সুপারশপে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নির্দিষ্ট মূল্য, ডিজিটাল পেমেন্ট ও সময় সাশ্রয়ের কারণে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আধুনিক এই কেনাকাটার ব্যবস্থা।

স্বপ্ন, ইউনিমার্ট, আপন ফ্যামিলি মার্ট, রনেক্সসহ বিভিন্ন সুপার শপ এখন নগরবাসীর কেনাকাটার অভ্যাসে জায়গা করে নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক আউটলেটে সাজানো তাক, আলাদা মাছ-মাংস বিভাগ, প্যাকেটজাত ও ওজন করা পণ্য, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন বিক্রয় পরিবেশ রয়েছে। ফলে বাজার করতে গিয়ে কাঁচাবাজারের ভিড়, কাদাপানি কিংবা মাছ-মাংসের তীব্র গন্ধের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে এসেছে। এসব সুপারশপে রয়েছে কাস্টমারভেদে মেম্বারশিপ অথবা ডিসকাউন্ট কার্ডের সুবিধাও। ডিজিটাল পেমেন্ট বা মোবাইলে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পেমেন্ট করলে থাকছে নির্দিষ্ট এমাউন্টের ক্যাশব্যাকের সুবিধাও। আবার কখনো কখনো পণ্যভেদে থাকছে বিভিন্ন রকমের ডিসকাউন্ট বা অফার পাইস। যা ভোক্তাদের দিচ্ছে সাশ্রয় ও স্বাচ্ছন্দ্যের ফুরসত।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী হাসিনা আক্তার বলেন, আগে সপ্তাহের ছুটির দিনে বাজার করতে গেলে কয়েক ঘণ্টা চলে যেত। মাছের জন্য এক জায়গা, মাংসের জন্য আরেক দোকান, সবজি ও মুদি পণ্যের জন্য আলাদা বাজারে যেতে হতো। এখন কাছের সুপারশপে ঢুকে প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই কেনা যায়। তাঁর মতে, সময় বাঁচানোটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। অফিস থেকে ফেরার পথেও সুপারশপে ঢুকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাসায় চলে যেতে পারি। আবার এসব সুপারশপে বিভিন্ন অ্যাপ কিংবা ই-ওয়ালেটে পেমেন্টের সুবিধা থাকায় টাকা-পয়সা বহন করার মতো ঝক্কি পোহানোর প্রয়োজন নেই। শবনম মুশতারী নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক গৃহিণীর অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম। তাঁর ভাষায়, কাঁচাবাজারে সন্তান সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। মেঝেতে পানি, মাছের আঁশ, মুরগির বর্জ্য ও প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে অস্বস্তি তৈরি হয়। সুপারশপে ট্রলি নিয়ে ধীরে ধীরে পণ্য বাছাই করা যায়। পণ্যের গায়ে মূল্য লেখা থাকায় দরদামের ঝামেলাও নেই। এসব সুপারশপেও তাজা শাক-সবজি, ফলমূল এবং জ্যান্ত মুরগিও মেলে। ফলে কেনার আগে দামও মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকে।

পকেটে টাকা না থাকলেও কেনাকাটা

সুপারশপের আরেকটি বড় সুবিধা হয়ে উঠেছে ডিজিটাল পেমেন্ট। নগদ টাকা বহনের প্রয়োজন ছাড়াই কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং ও বিভিন্ন ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে। এর মধ্যে বিকাশ, পকেট ও নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিকাশের মার্চেন্ট তালিকায় স্বপ্ন, ইউনিমার্ট ও আপন ফ্যামিলি মার্টের মতো সুপারশপের নাম রয়েছে। আবার এসব সুপারশপে রয়েছে মেম্বারশিপে সুবিধা। স্বপ্নের নিজস্ব অনলাইন পেমেন্ট নীতিতেও ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন ই-ওয়ালেট ব্যবহারের সুযোগের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক সুপারশপে কেনাকাটা এখন শুধু পণ্য বাছাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; পুরো লেনদেন ব্যবস্থাই ক্রমে ডিজিটাল হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া রাশেদ জামান নামের একজন তরুণ ক্রেতা বলেন, মানিব্যাগে নগদ টাকা না থাকলেও সমস্যা হয় না। প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে কাউন্টারে গিয়ে মোবাইলেই পেমেন্ট করা যায়। সময়ও কম লাগে।

ব্যস্ত নগরজীবন, কর্মজীবী নারী-পুরুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, ছোট পরিবারের প্রবণতা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কেনাকাটার চাহিদা সুপারশপের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। ক্রেতারা এখন শুধু পণ্য কিনতে চান না, কেনাকাটার সময়টুকুও স্বস্তিদায়ক করতে চান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আধুনিক খুচরা বাজারে সুপার শপের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে অনলাইন অর্ডার, হোম ডেলিভারি এবং ডিজিটাল পেমেন্ট যুক্ত হওয়ায় এ খাতের সেবাও বিস্তৃত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আধুনিক খুচরা বাজারের মূল শক্তি হচ্ছে ‘কনভেনিয়েন্স’ বা সুবিধা। একজন ক্রেতা যদি একই জায়গা থেকে সপ্তাহের বাজারের বেশির ভাগ পণ্য কিনতে পারেন তাহলে সময় ও শ্রম দুটোরই সাশ্রয় হয়। আবার বাইরে রোদ, বৃষ্টি কিংবা বাজারে যাওয়ার সময় না পেলে এসব সুপারশপের অনলাইন অর্ডার সিস্টেমে পণ্য অর্ডার ও হোম ডেলিভারি যুক্ত হওয়ায় সেই সুবিধা আরও বেড়েছে। ফলে বাজারে না গিয়ে অনলাইনে অর্ডার এবং অনলাইনে পেমেন্ট দিয়ে সুপারশপ থেকে বাজার করার সুবিধা জীবনকে করেছে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময়।

শুধু পণ্য নয়, অভিজ্ঞতাও

কাঁচাবাজারে পণ্য কেনার সঙ্গে দরদাম, ভিড়, পরিবেশগত বিড়ম্বনা ও সময়ক্ষেপণের বিষয়টি জড়িয়ে থাকে। সুপারশপে সেই অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভিন্ন। নির্দিষ্ট মূল্য, পণ্যের বিভাগভিত্তিক বিন্যাস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ট্রলি বা ঝুড়িতে পণ্য নেওয়ার সুবিধা এবং এক কাউন্টারেই বিল পরিশোধ-সব মিলিয়ে কেনাকাটাকে একটি সুশৃঙ্খল অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে। তবে সুপারশপের জনপ্রিয়তা বাড়লেও দেশের মোট খুচরা বাজারের বড় অংশ এখনো ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার ও ছোট দোকাননির্ভর। ফলে আধুনিক খুচরা বাজারের সামনে যেমন বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে পণ্যের দাম, মান, সরবরাহ ব্যবস্থা ও ভোক্তার আস্থার চ্যালেঞ্জ। তারপরও নগর জীবনের ব্যস্ততার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজার করার ধরন যে বদলাচ্ছে, তা স্পষ্ট। একসময় বাজার মানেই ছিল ভিড়, কোলাহল, কাদাপানি আর মাছ-মাংসের গন্ধ। এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ট্রলি হাতে নিয়ে এক জায়গায় চাল-ডাল, সবজি, মাছ-মাংস থেকে শুরু করে প্রসাধনী পর্যন্ত কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেক সুপারশপে রয়েছে চা, কফি কিংবা হালকা স্ন্যাক্সেরও সুবিধা। আবার কোথাও কোথাও রয়েছে বেবিজোন। যেখানে সঙ্গে যাওয়া শিশুরা খেলতে থাকে আর বাবা-মায়েরা নিশ্চিন্তে বাজার করেন। ফলে সুপারশপের ধারণা নাগরিক জীবনে এনেছে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এবং দৈনন্দিন জীবনে এনেছে প্রশান্তিকর ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights