কেনিয়ায় কেন সামরিক মহড়া বাতিল করল যুক্তরাজ্য?

অনলাইন ডেস্ক

কেনিয়ায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাজ্যের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ মহড়া। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন না মেলায় শেষ মুহূর্তে মহড়াটি বাতিল করেছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বহু দশকের পুরোনো যুক্তরাজ্য-কেনিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মহড়া বাতিলের মূল কারণ দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির বিভিন্ন ধারা নিয়ে মতবিরোধ। বিশেষ করে কেনিয়ার মাটিতে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনাদের আইনি এখতিয়ার, জবাবদিহি এবং অপরাধের অভিযোগ উঠলে বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে- এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই বিরোধ তীব্র হয়েছে।

বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি

দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুক্তরাজ্য-কেনিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সামরিক প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং সফররত সেনাদের আইনি অবস্থান নির্ধারণ করে।

কিন্তু কেনিয়ার আইনপ্রণেতাদের একটি অংশের দাবি, বর্তমান চুক্তিতে ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ কারণে চুক্তির বিভিন্ন ধারা পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হয়েছে।

বিএটিইউকে কী?

বিরোধের অন্যতম কেন্দ্র ব্রিটিশ আর্মি ট্রেনিং ইউনিট কেনিয়া (বিএটিইউকে)।

দীর্ঘদিন ধরে মধ্য কেনিয়ার নানিউকি এলাকায় অবস্থিত এই প্রশিক্ষণ ইউনিটে ব্রিটিশ ও কেনিয়ার সেনারা যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে আসছেন।

ব্রিটিশ সেনাদের জন্য এটি আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে কেনিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করারও সুযোগ তৈরি করে।

তবে বছরের পর বছর ধরে বিএটিইউকে ঘিরে মানবাধিকার, নজরদারি ও বিদেশি সেনাদের আইনি দায়বদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

কেনিয়ার উদ্বেগ

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে দেশটির পার্লামেন্টে আলোচনার সময় একাধিক আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তোলেন, কেনিয়ার ভূখণ্ডে দায়িত্ব পালনরত ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অন্য কোনও অপরাধের অভিযোগ উঠলে বর্তমান আইন কি যথেষ্ট কার্যকর?

সংসদের প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিএটিইউকে ঘিরে তাদের গুরুতর সংরক্ষণ রয়েছে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, “সমাজ হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

এসব উদ্বেগের কারণেই প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, যদিও উভয় দেশই নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

যুক্তরাজ্যের অবস্থান

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, কেনিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে।

এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, “কেনিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। এটি পারস্পরিক উপকার, সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।”

তবে অতীত ও সাম্প্রতিক সময়ে কেনিয়ায় ব্রিটিশ সামরিক উপস্থিতি ঘিরে যে বিভিন্ন বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও দুঃখ প্রকাশ করেছে লন্ডন।

মন্ত্রণালয় বলেছে, “কেনিয়ায় আমাদের প্রতিরক্ষা উপস্থিতি ঘিরে অতীত ও সাম্প্রতিক সময়ে যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।”

যুক্তরাজ্যের দাবি, কেনিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বজায় থাকলে যৌথ প্রশিক্ষণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বিরোধ?

বিশ্লেষকদের মতে, কেনিয়ার জন্য এই বিরোধের মূল বিষয় হলো—দেশের ভূখণ্ডে অবস্থানরত বিদেশি সেনাদের কার্যক্রমে সুস্পষ্ট আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে পূর্ব আফ্রিকায় যুক্তরাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার কেনিয়া। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্যও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক।

সাম্প্রতিক মহড়া বাতিলের ঘটনা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের সমাপ্তি নির্দেশ করে না। তবে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রতিটি ধাপই আরও কঠোর আইনি ও রাজনৈতিক পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

এখন লন্ডন ও নাইরোবির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে বিদ্যমান মতপার্থক্য দূর করে কয়েক দশকের পুরোনো সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

তবে সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে ভবিষ্যতে কেনিয়ায় ব্রিটিশ সেনাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশকেই তাদের সামরিক সহযোগিতার কাঠামো ও শর্ত পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মহড়া বাতিলই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কেনিয়ায় যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে জবাবদিহি ও আইনি কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন সমঝোতা গড়ে ওঠার ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights