কেন বারবার টানাপোড়েনের মুখে পড়ে ট্রাম্প ও ন্যাটোর সম্পর্ক?

অনলাইন ডেস্ক

তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান বিতর্কিত। তিনি একদিকে যেমন জোটটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে আবার দাবি করেছেন, তার চাপের কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

৭৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ন্যাটো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত হয়। কয়েক দশকের সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে ট্রাম্প বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপের নিরাপত্তার মূল ব্যয় বহন করছে যুক্তরাষ্ট্র, অথচ ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশ সে তুলনায় যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করছে না।

ইরান যুদ্ধ ঘিরে বাড়ে মতপার্থক্য
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ট্রাম্প ও ন্যাটোর সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর আগে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্র কিংবা ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক পরামর্শ করেননি। পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ন্যাটোর মিত্ররা অভিযানে অংশ নেয়নি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা দেয়নি।

এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে মতবিরোধ আরও গভীর হয়। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলো দাবি করে, যুদ্ধ শুরু করার আগে তাদের সঙ্গে কোনও ধরনের সমন্বয়ই করা হয়নি।

প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কৃতিত্ব দাবি
ন্যাটো নিয়ে সমালোচনা করলেও ট্রাম্প প্রায়ই দাবি করেন, তার কঠোর অবস্থানের কারণেই জোটভুক্ত দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর সবচেয়ে বড় আর্থিক ও সামরিক বোঝা বহন করেছে। তাই সদস্য দেশগুলোরও নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নেওয়া উচিত।

তবে সমালোচনার পাশাপাশি ট্রাম্প সময়ে সময়ে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিও নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা জোটের প্রতি তার অবস্থানকে অনেক ক্ষেত্রেই দ্বৈত বার্তা হিসেবে দেখা হয়।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন বিতর্ক
ট্রাম্প-ন্যাটো সম্পর্কের আরেকটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রিনল্যান্ড।

ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ‘তারা পছন্দ করুক বা না করুক’, যুক্তরাষ্ট্র সেটি অধিগ্রহণ করবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এবং জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

পরবর্তীতে ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে এলেও, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিরোধিতা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

সম্মেলনে নজর থাকবে ট্রাম্পের অবস্থানের দিকে
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের অন্যতম লক্ষ্য হবে ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করা এবং জোটের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি অটুট রাখা।

তবে ইরান যুদ্ধ, ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যয় এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলমান মতবিরোধের কারণে ট্রাম্প ও ন্যাটোর সম্পর্ক এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। ফলে এবারের সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তব্য ও অবস্থানের দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights