কেন হিংস্র সাপ-কুমিরকে বাংলাদেশের সীমান্ত দেয়াল বানাচ্ছে ভারত?

অনলাইন ডেস্ক

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সুদীর্ঘ ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এখন এক নতুন বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। দীর্ঘ দিন ধরে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকানোর চেষ্টা করলেও নদীমাতৃক ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলো দিল্লির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যার সমাধানে এবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার কথা ভাবছে। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, সীমান্তের যেসব নদীপথে বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে কুমির এবং বিষধর সাপ ছেড়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে।

বিএসএফ-এর সদর দপ্তর থেকে জারি করা এক সাম্প্রতিক নির্দেশনায় পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ইউনিটগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন নদীপথে এই ধরনের হিংস্র সরীসৃপ মোতায়েন করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে। মূলত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় এবং মিজোরামের সীমান্ত দিয়ে যে নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই ‘প্রাকৃতিক প্রাচীর’ তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, পাহাড়ি ঢল এবং জলাভূমির কারণে অনেক স্থানে স্থায়ী বেড়া নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার সুযোগ নিয়ে অবৈধ যাতায়াত এবং পাচার চললে দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনা সামনে আসার পর থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী এবং পরিবেশবাদীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হিংস্র বন্যপ্রাণীকে রাজনৈতিক বা সীমান্ত নিরাপত্তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা একটি চরম অমানবিক পদক্ষেপ হতে পারে। তাদের মতে, এটি কেবল অনুপ্রবেশকারীদের জন্যই নয় বরং সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী সাধারণ মৎস্যজীবী এবং স্থানীয় মানুষের জীবনের জন্যও চরম ঝুঁকি তৈরি করবে। বিশেষ করে নদীমাতৃক এই অঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষগুলো প্রতিনিয়ত পানির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে, যেখানে কুমির বা সাপের উপস্থিতি তাদের জীবনকে মৃত্যুকূপে পরিণত করবে।

আলোচকরা আরও বলছেন, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণীকে মানুষের বিরুদ্ধে এভাবে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি আধুনিক বিশ্বে নজিরবিহীন। গবেষক অংশুমান চৌধুরী এই পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, সাপ বা কুমির কখনোই জানে না কে ভারতীয় আর কে বাংলাদেশি। তারা কেবল তাদের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে আক্রমণ করবে। এটি কোনোভাবেই একটি সভ্য রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার কৌশল হতে পারে না। এই প্রক্রিয়াটিকে তিনি ‘জীববৈচিত্র্যগত সহিংসতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা মূলত মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করার নামান্তর।

পরিবেশগত দিক থেকেও এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তের সব নদীতে কুমিরের প্রাকৃতিকভাবে বসবাসের পরিবেশ নেই। সুন্দরবনের লবণাক্ত পানির কুমির বা আসামের বিশেষ জলাভূমির প্রাণীকে যদি জোরপূর্বক সাধারণ নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তারা সেখানে টিকে থাকতে পারবে না। এছাড়া বন্যার সময় এই বিষধর সাপ বা কুমিরগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, যা জননিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাস্তুসংস্থানের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত সরকারের এই কঠোর নীতির পেছনে একটি ধর্মীয় ও জনতাত্ত্বিক বয়ান কাজ করছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অবৈধ অভিবাসীরা ভারতের জনমিতি বদলে দিচ্ছে। এই ভীতিকে কাজে লাগিয়ে মূলত মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে অনেক মানবাধিকার কর্মী অভিযোগ করেছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারা অনেক মানুষকে জোরপূর্বক পুশব্যাক করার ঘটনাও নতুন নয়। এখন কুমির ও সাপের মতো ভয়ংকর প্রাণীকে সেই তালিকায় যুক্ত করা এই মানসিকতারই এক চরম বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধরণের উদ্যোগের খুব একটা উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার মেক্সিকো সীমান্তে সাপ ও কুমির ভর্তি পরিখা খননের কথা বলেছিলেন, যা নিয়ে সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হাসাহাসি হয়েছিল। তবে অতি সম্প্রতি ফ্লোরিডায় একটি আটক কেন্দ্রে দুর্গম পরিবেশকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিকল্পনা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা হবে বিশ্বের অন্যতম নিষ্ঠুর সীমান্ত নীতি। এটি কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয় বরং প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights