কোরআন পড়েও অনেকের হেদায়াত জোটে না কেন?

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

নবীজি (সা.) তখন মদিনায়। চলছে ইসলামের দাওয়াতের সোনালি অধ্যায়। এ সময় রসুল (সা.)-কে সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করেছে ইহুদি সম্প্রদায়ের আলেমরা। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, নবুয়াতি জীবনে বিশেষ করে মদিনায় রসুল (সা.)-কে বেশি সহযোগিতা করেছেন ইহুদি ধর্মের সাধারণ অনুসারীরা। তাদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে সহযোগিতা করেছেন। আবার অনেকে ইহুদি থাকা অবস্থায়ই হুজুর (সা.)-কে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। তবে বিরক্ত করেছেন ইহুদি আলেমরা। যাদের কিতাবের জ্ঞান ছিল। এই আলেম নামধারী ধর্মব্যবসায়ীরা অন্তত চুপ থাকলেও নবীজি (সা.) অনেক জঞ্জাল থেকে বেঁচে যেতেন। ইহুদি আলেমদের চরিত্র সম্পর্কে আল্লাহ নবীজি ও মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা দেখতে পাচ্ছ, আল্লাহর বাণী শুনে এবং ভালো করে বোঝার পরও একে বিকৃত করা ওদের একটি দলের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর পরও কি তোমরা আশা কর, ওরা তোমাদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইমান গ্রহণ করবে?’ (সুরা বাকারা-৭৫)

প্রায় সব মুফাসসির একমত এ আয়াত হজরত মুসার (আ.) সময়ের আলেমদের চরিত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে। তারা আল্লাহর কালাম শুনত, বুঝত কিন্তু ব্যাখ্যা করার সময় আয়াতের মূলভাব বিকৃত করে বলত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘এ আয়াতে ওইসব লোকের কথা বলা হয়েছে যারা নিজ কানে আল্লাহর কথা শোনার দাবি জানিয়েছিল। মুসা (আ.) তাদের ভালোভাবে পাকসাফ করে রোজা অবস্থায় তুর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। তারা সেজদায় পড়ে রইলেন আর মুসা (আ.)-এর দোয়ার ফলে আল্লাহ তাদের কালাম শোনালেন। কালাম শোনা শেষ হলে তারা লোকালয়ে ফিরে এসে তা বিকৃতভাবে বর্ণনা করতে থাকল। মুসা (আ.) যেভাবে বলছেন তারা ঠিক তার উল্টোভাবে মানুষকে আল্লাহর কালাম শোনাতে লাগলেন। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী এ ধারা চলতে থাকে এবং হুজুর (সা.)-এর সময়ও ইহুদি আলেমরা তাদের ওপর নাজিল হওয়া কিতাবের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে যেতে থাকে। এসব আলেমকে উদ্দেশ করেই আল্লাহ বলেছেন, যারা নিজ কানে আল্লাহর কালাম শোনার পরও ভুল ব্যাখ্যা করার মতো দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে, তাদের উত্তরসূরিরা আজ কোরআন শুনে ইমান আনবে সে প্রত্যাশা মুমিন সমাজ কীভাবে করতে পারে। (ইবনে কাসির)

বাংলাদেশের অন্যতম ধর্মপন্ডিত মাওলানা আকরম খাঁ একমাত্র মুফাসসির যিনি বলেছেন, এ আয়াত হুজুর (সা.)-এর সময়কার ইহুদিদের ব্যাপারে নাজিল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইহুদিরা নানাভাবে নবীজিকে পরীক্ষা করে। প্রতিটি পরীক্ষায়ই নবীজি (সা.) সত্য নবী প্রমাণিত হন। এর মধ্যে একটি পরীক্ষা হলো, খায়বার থেকে ফেরার পথে জয়নব নামে এক ইহুদি নারী রসুল (সা.)-এর খাবারে ভয়ংকর বিষ মিশিয়ে দেয়। নবীজি খাবার মুখে দিয়েই বুঝতে পারেন এটা বিষ এবং তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র। তিনি খাবার ফেলে দেন এবং অন্যদের তা খেতে নিষেধ করেন। ততক্ষণে পাশে থাকা বেশর (রা.) খাবার খেয়ে ফেলেন এবং বিষক্রিয়ায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে তিন দিন পর ইন্তেকাল করেন। নবীজি ইহুদিদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেন আমাকে মারতে চাইলে? ইহুদিরা বলল, ‘আমরা পরীক্ষা করতে চাইলাম আপনি সত্য নবী কি না। সত্য নবী হলে আপনাকে বিষ খাইয়ে মারা সম্ভব নয়। বরং আল্লাহ আপনাকে এ ব্যাপারে জানিয়ে দেবেন।’ অবশ্য জয়নব বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাকে মারার জন্যই খাবারে বিষ দিয়েছি। আপনি যুদ্ধে আমার স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের লোকদের মেরেছেন। আমি তারই প্রতিশোধ নিতে চাইলাম। এখন আপনি চাইলে আমাদের থেকে প্রতিশোধ নিতে পারেন। নবীজি (সা.) বললেন, ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নেওয়া আমার জন্য শোভা পায় না। আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম। তাওরাতে আখেরি নবীর গুণাগুণ বর্ণনায়ও এ কথা বলা ছিল- তিনি ব্যক্তিগত ক্ষতির প্রতিশোধ নেবেন না। ইহুদিরা এ বিষয়টি পড়েছে। জেনেছে। বুঝেছে। কিন্তু চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখেও তারা ইমান আনেনি। এমন অনেকবরাই ইহুদিরা নবীজির সত্যতার বিষয়টি তাদের কিতাব থেকেই প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু তারা ইমান আনেনি। সে কথাই আয়াতে আল্লাহতায়ালা পরিষ্কার করে দিলেন, ‘এ ধরনের বিকৃত মনের মানুষ যতই কিতাব পড়ুক না কেন তারা আসলে ইমান আনবে না।’
বর্তমান সময়ের সঙ্গেও এ আয়াতের মিল পাওয়া যায়। একদল মানুষ আছে তারা কোরআন পড়ে, গবেষণা করে, কিন্তু মানুষের মাঝে এসে ভুল ব্যাখ্যা করে। কোরআন দিয়েই কোরআন ভুল প্রমাণের মিথ্যা চেষ্টা করে। মূলত কম জ্ঞানী নাস্তিক বন্ধুরাই এমনটি বেশি করে থাকে। আর কোনো কোনো আলেমও এমন আছেন যারা কোরআন পড়েন কিন্তু দলীয় গোঁড়ামি বা নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বোঝার পরও সঠিক কথাটি তারা মানুষকে বলেন না। এ আয়াত অনুযায়ী এরাও খাঁটি মুমিনের কাতারে পড়বে না। কোরআন থেকে হেদায়াত পাওয়ার প্রথম শর্তই হলো সব ধরনের গোঁড়ামিমুক্ত হয়ে কোরআন পড়তে হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিন।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights