ক্রিকেটে রাজনীতি-সংঘাত, দায়ী কে ভারত নাকি পাকিস্তান?
অনলাইন ডেস্ক
ক্রিকেট ভক্তদের অবশ্যই ১৯৯৯ সালের পাকিস্তান দলের ভারত সফরের কথা মনে আছে।
কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শিবসেনা পাকিস্তানকে ভারতের কোনো ক্রিকেট মাঠেই দেখতে চায়নি। তাদের কর্মীরা নয়াদিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামের পিচ খুঁড়ে নষ্ট করে দেয়। তারা পাকিস্তান হাইকমিশনে হামলা চালায় এবং সফররত খেলোয়াড়দের হত্যার হুমকি দেয়। পুরো কর্ককাণ্ডই ছিল প্রকাশ্য আর হইচই জাগানিয়া। জোর করে ক্রিকেট বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলো তারা।
কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম ভয় পেয়ে সফর ভেস্তে যেতে দেননি। তিনি টিম ম্যানেজারকে বলেছিলেন, না স্যার, আমরা গিয়ে খেলব। ক্রিকেট আলাদা, রাজনীতি আলাদা।
সেই ধরনের ক্রীড়াসুলভ মনোভাব এখন রাজনীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের খেয়ালখুশির কাছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্রমেই জিম্মি হয়ে পড়েছে।
এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। শনিবার শুরু হওয়া ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল এই ম্যাচটি।
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, দল টুর্নামেন্টে থাকলেও তারা ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। ইসলামাবাদ বলছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে। বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ভারতেরই কূটকৌশলে।
বাংলাদেশের ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে আসন্ন আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে টেনেছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই তার চুক্তি বাতিল করা হয়।
ভারতে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। তাদের দাবি ছিল, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে কোনো বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে ভারতে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। যদিও ঢাকা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রতিবাদের পর ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই কোনো কারণ না জানিয়ে কেকেআরকে চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেয়। এই সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরানোর অনুরোধ জানায়।
সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানও এই বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
ভারতীয় গণমাধ্যম পাকিস্তানকে ক্রিকেটকে রাজনীতিকরণ করার অভিযোগে আক্রমণ করেছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, খেলাটির চরিত্র বদলে দেওয়ার কাজটি আসলে করেছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে থাকা নয়াদিল্লি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় দল পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, মাঠ ছেড়েছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত না মিলিয়ে এবং বৈশ্বিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসির সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে তাদের আর্থিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।
২০১৩ সালের পর থেকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়নি। এরপরের সব ম্যাচই হয়েছে বহুজাতিক টুর্নামেন্টে, সাধারণত নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। এই নীতি ভারত সরকারের নির্দেশনার প্রতিফলন এবং বিসিসিআই তা বাস্তবায়ন করে।
এই নীতি এখন টুর্নামেন্টগুলোর কাঠামোকেও নতুন করে গড়ে দিচ্ছে।
২০২৩ সালে এশিয়া কাপ আয়োজনের স্বত্ব পায় পাকিস্তান। ভারত দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল তখন বিপাকে পড়ে। শেষ পর্যন্ত একটি হাইব্রিড মডেল তৈরি হয়। যেখানে ভারতের ম্যাচগুলো পাকিস্তানের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে আয়োজক হিসেবে পাকিস্তানের অধিকার খর্ব হয় এবং ভূরাজনীতির কারণে একটি নজির স্থাপিত হয়।
একই চিত্র দেখা যায় ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও। আয়োজক ছিল পাকিস্তান এবং ম্যাচগুলো সেখানেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত তাদের ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরিয়ে নেয়।
যে টুর্নামেন্টটি হোম আয়োজন হিসেবে দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা আবারও ভাগাভাগির আয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হওয়া এশিয়া কাপেও ভারতের খেলোয়াড়রা টসের সময় এবং ম্যাচ শেষে পাকিস্তানের দলের সঙ্গে একাধিকবার হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়।
হাত মেলানোর কোনো আইন নেই। কিন্তু এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রোটোকল। গভীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের বার্তা দেয়।
ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর পুরস্কার বিতরণীতেও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভারতীয় খেলোয়াড়রা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি মোহসিন নকভির কাছ থেকে ট্রফি ও পদক নিতে অস্বীকৃতি জানান। নকভি একই সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান।
একই টুর্নামেন্টে প্রতীকী রাজনীতিও চোখে পড়ে। ভারতের অধিনায়ক প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়টি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে উৎসর্গ করেন। এতে ক্রীড়া সাফল্যকে জাতীয় নিরাপত্তার বয়ানের সঙ্গে জুড়ে যায়। ভারতে এটি হাততালি পেলেও ক্রিকেট যে সীমারেখা ধরে রাখতে চেয়েছিল, তা ঝাপসা হয়ে যায়।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এসব ঘটনা ঘটেছে, যেখানে খেলাধুলাকে ক্রমেই রাষ্ট্রীয় অবস্থানের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তান যখন কলম্বোতে ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত জানায়, তখন ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক কণ্ঠ এবং সাবেক ক্রিকেটাররা দ্রুতই একে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন।
কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নাজাম শেঠি একটি ভারতীয় সংবাদ চ্যানেলকে বলেন, ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা উচিত নয়।তিনি বলেন, যদি এক পক্ষ (ভারত) রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এক সময় না এক সময় সবাই সেই পথেই হাঁটবে। বাংলাদেশ এখন সেটাই করেছে, পাকিস্তানও একই পথে গেছে। তার মতে, সমস্যাটা বিসিসিআইয়ের মানসিকতায়। প্রতিটি ধাপে তারা অন্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে থেকেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন খেলাধুলা ও রাজনীতির সংঘাত নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি বলেন, খেলাধুলা, ক্রিকেট আর রাজনীতি সবসময়ই একে অপরের সঙ্গে জড়িত ছিল। স্কাই স্পোর্টসে হুসেইন ২০০৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের না খেলার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এর কিছুটা ছিল নিরাপত্তার কারণে, আর বড় একটা অংশ ছিল মুগাবে সরকারের জন্য।
নাসিরের মতে, যা বদলেছে তা হলো এর ঘনত্ব। আগে এটা ছিল ব্যতিক্রম। এখন এটা নিয়ম হয়ে গেছে। আর বিষয়টি শুধু সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শুধু রাজনীতিবিদ নয়, খেলোয়াড়রাও হাত না মেলানো, ট্রফি না তোলা। ক্রিকেট একসময় দেশগুলোকে এক করত, এখন মানুষকে আলাদা করছে।
হুসেইন বর্তমান সংকটের সূত্রপাতের দিকেও ইঙ্গিত করেন।তিনি বলেন, এই সাম্প্রতিক সংকটের শুরুটা কোথায়, সেটা মনে রাখতে হবে। তিনি (মুস্তাফিজ) আইপিএল স্কোয়াডে ছিলেন, আর হঠাৎ করেই তাকে বের করে দেওয়া হলো। সেই একটি সিদ্ধান্ত থেকেই সবকিছু ঘটেছে।
তবে তার মতে, মূল সমস্যা হলো সামঞ্জস্যের অভাব। বিশ্বকাপের এক মাস আগে যদি ভারত বলে যে তাদের সরকার খেলতে চায় না, তাহলে আইসিসি কি এতটাই কঠোর হতো? সেই প্রশ্নও তুলেছেন নাসির।
এই সময়ের অনেক আগেই, এই অঞ্চলের খেলোয়াড়রা ভিন্ন আবেগে কথা বলতেন। ২০১৯ সালে পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদ বলেছিলেন, ভারতের বিপক্ষে খেলা মানে ছিল শত্রুর সঙ্গে খেলা।
তিনি দুই দেশকে থেমে ভাবার আহ্বান জানিয়েছিলেন, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা মূল্য চুকিয়ে নিচ্ছে তা নিয়ে। বিরোধী হয়ে আমরা কী অর্জন করব? প্রশ্নটাও করেছিলেন তিনি।তার আরও প্রশ্ন ছিলো, একটা খেলা কেন রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষতিপূরণ হয়ে উঠবে?
মিয়াঁদাদ স্মরণ করেন, ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কার ও বিষণ সিং বেদিরা যখন দ্বিপাক্ষিক সিরিজে পাকিস্তানে আসতেন, তখন হোটেলে নয়, স্থানীয়দের বাড়িতে থাকতেন।
মিয়াঁদাদ জয়পুরের এক জৈন পরিবারের কথাও বলেন, যারা পরে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যায় এবং সফরে গেলে তার জন্য রান্না করত। তার ভাষায় ‘ওরা আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিল।’
মিয়াঁদাদ ১৯৭৮-৭৯ সালের ভারত সফরের কথাও স্মরণ করেন। এটি ছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রথম ভারত সফর। যে যুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা পেতে সহায়তা করেছিল। অনেক ভারতীয় খেলোয়াড় পাকিস্তানি পরিবারগুলোর সঙ্গেও থেকেছিলেন। মিয়াঁদাদ বলেন, ভাবুন সেই আতিথেয়তা, ভাবুন সেই ভালোবাসা।
১৯৯৯ সালে পাকিস্তান দল ভারতে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে উত্তেজনাও কমে যায়। উইজডম নামের ক্রিকেট রেফারেন্স বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, চেন্নাইয়ে প্রথম টেস্টে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন, দিল্লিতে ছিল প্রায় ৪০ হাজার।
সিরিজ কলকাতায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে টানাপোড়েন অনেকটাই কমে যায়। উইজডম পরে লিখেছিল, এই সফরটি ছিল ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। তারা এক ভারতীয় লেখকের উদ্ধৃতি দিয়েছিল, যেখানে বলা হয়েছিল, সন্দেহবাদী এবং সমালোচকরা যারা সিরিজ বানচালের হুমকি দিয়েছিল তারা নীরব হয়ে যায়; ভারত সরকার দেখিয়েছিলো তাদের দৃঢ়তা…।
তবে এখন সেই ভারত সরকারই উগ্রবাদীদের আস্তানা। ঘৃণা ছড়ানোই ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি। সুতরাং প্রশ্নের উত্তর মনে হয় মিলেই গেছে, ক্রিকেটকে আসলে রাজনীতির হাতিয়ার বানাচ্ছে কারা?
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
