ক্রুড অয়েল সংকটে ইস্টার্ন রিফাইনারির দুই ইউনিট বন্ধ
বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
ক্রুড অয়েলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরএল) ডিস্টিলেশন ইউনিটসহ দুটি ইউনিট। এতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইআরএলের একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সোমবার রাতে ইউনিট (প্ল্যান্ট) দুটি সাময়িক বন্ধ করা হয়। ক্রুড অয়েলের নতুন চালান না আসা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় কিছু রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সেরে নেওয়া হবে। মে মাসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় সপ্তাহে ক্রুড অয়েলের নতুন একটি চালান দেশে এসে পৌঁছাতে পারে। তখন ইউনিট দুটি আবার চালু করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দুটি ইউনিট বন্ধ হলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রতি বছর একবার ওভারহলিংয়ের জন্য এক থেকে দেড় মাস এমনিতেই প্ল্যান্ট বন্ধ রাখা হয়।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘতের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে ক্রুড অয়েল আমদানি করতে না পারায় কাঁচামাল সংকটে পড়ে ইআরএল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দুটি ইউনিট বন্ধ হওয়ায় ডিজেল উৎপাদন ব্যাহত হলেও পেট্রোল, বিটুমিনসহ আরও কিছু পণ্য উৎপাদন অব্যাহত আছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত শোধনাগারটিতে ডিজেল ছাড়াও এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল, কেরোসিন ন্যাপথা, বিটুমিনসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি ও উপজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়। দেশে প্রতি বছর জ্বালানির চাহিদা প্রায় ৬৮ লাখ মেট্রিক টন। এর ২০ শতাংশের কম চাহিদার জোগান দেয় ইস্টার্ন রিফাইনারি। বাকি চাহিদা পূরণ হয় আমদানিকরা পরিশোধিত জ্বালানির মাধ্যমে।
সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল দেশে এসেছিল। এরপর আর কোনো অপরিশোধিত তেলের জাহাজ পৌঁছায়নি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ অয়েল করিডর হিসেবে খ্যাত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ পথে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন হয়। বাংলাদশের অপরিশোধিত জ্বালানিও সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এ পথেই আমদানি করা হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য বিপিসি সাধারণত প্রতি দুই মাসে ক্রুড অয়েলের তিনটি চালান আমদানি করে থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেখা দেওয়ার পর নতুন চালান আনতে না পারায় দেখা দিয়েছে কাঁচামালের সংকট।
জ্বালানি নিয়ে দুই মাস সমস্যা নেই : দেশে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটেছে। তবে মজুত থাকায় জ্বালানি তেল নিয়ে আগামী দুই মাস কোনো সমস্যা নেই। দেশের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই বরং আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতাই বাজারে চাপ বাড়াচ্ছে।
গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা।
মনির হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন, ফার্নেস তেল ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন এবং জেট ফুয়েল ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন। অকটেন ও পেট্রোলের মজুত দিয়ে আগামী দুই মাসেও কোনো সমস্যা হবে না। ডিজেলের ক্ষেত্রেও এপ্রিল তো বটেই, মে মাসেও সমস্যা দেখছি না বলে জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধোনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বন্ধ থাকলেও দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না। মার্চ মাসের নির্ধারিত অপরিশোধিত তেল সময়মতো না পৌঁছায় বর্তমানে ইআরএল সীমিত সক্ষমতায় (লো-ফিডে) চালু রাখা হয়েছে। ইআরএলের মোট চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি মেইনটেন্যান্সে এবং দুটি চালু রয়েছে। এ সময় জানানো হয়, এপ্রিল মাসের নির্ধারিত ১ লাখ মেট্রিক টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েলের কার্গো ২০ এপ্রিল লোডিং সম্পন্ন করে ২-৩ মের মধ্যে বিকল্প বন্দর ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে। মে মাসে ১ লাখ মেট্রিক টন মারবান ক্রুডের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১ লাখ মেট্রিক টন এএলসি সরবরাহের জন্য সৌদি আরামকোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। জরুরি চাহিদা পূরণে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানির জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন দিয়েছে।
