খড়মপট্টি আছে খড়ম নেই

প্রিন্ট ভার্সন

রংপুর নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের গুপ্তপাড়ার একটি অংশের নাম খড়মপট্টি। এক সময় সেখানে দিনে রাতে খড়ম তৈরি হতো। এখন খড়ম না থাকলেও খড়মপট্টির নামটি রয়েই গেছে। ৪-৫ দশক আগে এখানে কাঠের খড়ম তৈরি হতো। সেই খড়ম রংপুরের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি হতো। এখন সেই সব অতীত। খড়ম হারিয়ে গেলেও গ্রামের নামটি খড়মের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। খড়মপট্টির রাস্তার দুই পাশে এখন বড় বড় অট্টালিকা। বহুতল ভবনের চাপায় হারিয়ে গেছে খড়মের ইতিহাস।

ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে খড়মের ব্যবহার অনেক প্রাচীন। তবে ১৩০৩ সালে বিখ্যাত সুফি দরবেশ ও পীর হজরত শাহজালাল (রহ.) সুদূর তুরস্ক থেকে সিলেটে এসেছিলেন খড়ম পায়ে দিয়ে। তার ব্যবহৃত খড়ম এখনো তাঁর সমাধিস্থল সংলগ্ন স্থাপনায় রক্ষিত আছে। সেই সময় থেকে বাংলার ভূস্বামী, জমিদার ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজনের মধ্যে খড়মের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। কয়েক দশক আগেও খড়মের শব্দ শুনে বুঝা যেত রাস্তা দিয়ে কেউ যাচ্ছেন। বাংলায় পাদুকা বা জুতা বলতে তখন কাঠের তৈরি সেই খড়মকেই বোঝানো হতো। পুকুরঘাটে পা ধোয়া, কিংবা রাতে শোবার আগে পা ধুয়ে আসতে খড়ম ব্যবহার ছিল আবশ্যকীয়। একটা সময় খড়মকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে খড়ম নামটি জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে।

জানা গেছে, খড়ম একপ্রকার কাঠের পাদুকা হিন্দি ‘খড়ৌঙ’ শব্দটি থেকে বাংলায় ‘খড়ম’ শব্দটির উৎপত্তি। সংস্কৃতে খড়ম ‘পাদুকা’ নামে পরিচিত। হিন্দুধর্মে খড়মের ব্যবহার সুপ্রচলিত। হিন্দুরা খড়মকে দেবতা ও শ্রদ্ধেয় সাধুসন্তদের পদচিহ্নের প্রতীকও মনে করেন। হিন্দুধর্মের পাশাপাশি জৈনধর্মেও ভিক্ষাজীবী সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তরা খড়ম ব্যবহার করে থাকেন। হিন্দুদের মহাকাব্য রামায়ণে খড়মের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে জানা গেছে। এক খণ্ড কাঠ পায়ের মাপে কেটে খড়ম তৈরি করা হয়। সম্মুখভাগে একটি বর্তুলাকার কাঠের গুটি বসিয়ে দেওয়া হয়, যা পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের আঙুলটি দিয়ে আঁকড়ে ধরা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, মানুষ জুতা পরতে শিখেছিলেন খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। তবে পৃথিবীর প্রাচীনতম কাঠের জুতা বা খড়মের প্রথম সন্ধান মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন অঙ্গরাজ্যে, যা ছিল ৭-৮ হাজার বছর আগের তৈরি। অনেকের মতে, কাঠের টুকরা দিয়ে তৈরি প্রাচীনতম খড়মটি ছিল ১৩০০ শতকের, যা ব্যবহৃত হয়েছিল নেদার‌্যান্ডে। ডাচ্ কৃষক, কারিগর ও জেলেদের কাছে তখন সাশ্রয়ী ও টেকসই পাদুকা হিসেবে সেগুলোর ছিল দারুণ সমাদর। জানা গেছে, ১৭০০ শতকে ইউরোপে তৈরি যে খড়ম ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তার নাম ছিল ‘হাইহিল’।

রাজা যে পথে যেতেন সে পথে প্রজাদের পাদুকা পায়ে হাঁটা নিষিদ্ধ ছিল। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই প্রথম যে হাইহিল জুতার প্রচলন করেছিলেন তা সর্বসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। হাইহিলকে কেন্দ্র করেই ফ্রান্সে দফায় দফায় যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। ফ্রান্সের হাইহিল লন্ডনের রাজপরিবারেও একসময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে যুক্তরাজ্যে প্রায় শত বছর ধরে হাইহিল জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। বৃষ্টির দিনে নারীদের ব্যবহারের জন্য ১৮০০ শতকে জাপানে লালফিতা বিশিষ্ট ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা যে খড়ম তৈরি হতো সেগুলোর নাম ছিল ‘ওকোবো’। চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত লেবানিজদের ব্যবহৃত খড়ম ‘কাবকাবস’ নামে পরিচিত ছিল। জাপানে খড়মের নাম ‘গেটা’। আর স্পেনে ‘আলবারকাস’। নবম শতকে প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে মানুষ খড়ম ব্যবহার করতেন। ভারতবর্ষে খড়মের জনপ্রিয়তা ১৭০০ শতকে এসে দারুণভাবে বেড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights