খবরটি প্রথম বাবাকে জানিয়েছিলেন সূর্যবংশী

অনলাইন ডেস্ক
বিহারের সঞ্জীব একসময় নিজেই স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পিছিয়ে থাকা বিহারের সীমাবদ্ধতায় সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ছেলের চোখে, ছেলের পথচলায়। আজ সেই স্বপ্ন শুধু তাদের পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ভারতজুড়ে, এমনকি ক্রিকেট বিশ্বেও।

বাবার পুরো নামটি উচ্চারণ করলেই ছেলেকে চিনে নিতে আপনার এক মুহূর্তও দেরি হবে না—সঞ্জীব সূর্যবংশী।

সঞ্জীবের ছেলে বৈভব সূর্যবংশী শনিবার ভারতের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ১৫ বছর ৯৯ দিনে। শচিনকে হটিয়ে তিনি এখন ভারতের সবচেয়ে কমবয়সী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। কিন্তু বৈভব এখন আর সঞ্জীবের একার স্বপ্ন নয়, একার সন্তান নয়। কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার বৈভবকে আখ্যায়িত করেছেন ‘বেবি অব ইন্ডিয়া বা ভারতের শিশু’ হিসেবে।

নিজের ক্রিকেটার হওয়ার পথে যা যা প্রতিবন্ধকতা ছিল, সঞ্জীব চেষ্টা করেছেন বৈভবের পথ থেকে তা সরিয়ে দিতে। মাত্র চার বছর বয়সে বৈভবের হাতে ‍তুলে দেন ক্রিকেট ব্যাট, নিজে বনে যান ছেলের কোচ। বিহারের সমস্তিপুরে ভালো ক্রিকেট একাডেমি নেই, তাই সপ্তাহে অন্তত ৪ দিন ছেলেকে নিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে পাটনার একটি ক্রিকেট একাডেমিতে যেতেন সঞ্জীব, যাতে বৈভব ভালো বোলারদের মুখোমুখি হতে পারে।

ছেলের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং একাডেমির খরচ জোগাতে সঞ্জীব তার শেষ সম্বল চাষের জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। কোভিডের সময় সব একাডেমি বন্ধ থাকায় বাড়ির ভেতরে পিচ বানিয়ে ছেলের অনুশীলন অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন সঞ্জীব। শুধু বৈভব নয়, বৈভবকে যারা নেটে বল করতো, তাদের জন্যও খাবারের ব্যবস্থা করতেন সঞ্জীব। এক কথায় সন্তানের ব্যাটে নিজের স্বপ্নপূরণের চেষ্টায় কোনো কমতি রাখেননি সঞ্জীব। তার চেষ্টা বৃথা যায়নি। তাই তো বিহারের সমস্তিপুরের সেই শিশু বৈভব আজ ক্রিকেট জগতেরই বিস্ময়, গোটা ভারতের স্বপ্ন।

শনিবার ভারতের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার খবরটি বৈভব প্রথম জানিয়েছিলেন তার বাবাকে। বয়স কম বলে বিসিসিআই বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এবং বোর্ডের খরচে বৈভবের বাবা-মাকেও আয়ারল্যান্ড-ইংল্যান্ড সফরে দলের সাথে একই হোটেল রাখার ব্যবস্থা করেছে।

হোটেলের রুমে ফিরে বাবাকেই প্রথম খবরটি জানান বৈভব, ’খবরটি পাওয়ার পর আমি প্রথম নিজের রুমে যাই এবং আমার বাবাকে বলি। তিনি আমার সাথেই থাকছেন। আমি প্রথমে তাকেই জানিয়েছিলাম। অন্য কাউকেই বলিনি। এরপর আমার মা এবং আমার কোচ রমি স্যারকে জানাই। বাবা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন এবং আমাকে একইভাবে খেলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, কোনো চাপ নেই, শুধু নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলে যাও।’

ভারতের হয়ে খেলাটা বৈভবের জন্য গর্বের, ‘খুবই ভালো লাগছে। ভারতের হয়ে খেলা যেকোনো ভারতীয়র জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়, কারণ প্রতিটি ক্রিকেটারই দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং দেশকে গর্বিত করতে চায়।’

বৈভবের হাতে দলের অভিষেক ক্যাপ তুলে দিয়েছিলেন দলের সহ অধিনায়ক তিলক ভার্মা। তখন তিনি বৈভবকে বলেছিলেন, ’প্রথমত, এটি তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি মুহূর্ত। তাঁরা সত্যিই তোমার পেছনে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তুমি নিজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এই ক্রিকেট ক্যাপটি অর্জন করেছ। কোনো ভয় ছাড়া নিজের স্বাভাবিক ক্রিকেট খেলো, এখানে কোনো কিছুই বদলে যায়নি। সঠিক মানসিকতা এবং মুখে হাসি নিয়ে খেলাটা উপভোগ করো।’

সূর্যবংশীর মুখের হাসি এখন গোটা ভারতের হাসি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বৈভবের ছেলেবেলার কোচ মনিষ ওঝা বলছেন, ভারতের হয়ে তার আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়াটা এক সঙ্গে গর্ব ও আবেগের মুহুর্ত। তবে কঠোর পরিশ্রম আর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে এ সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, আইপিএল আর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে যা করেছে, বৈভবের সামনে এখন সুযোগ আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তা দেখিয়ে দেয়ার।

বৈভবের সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার। তিনি বরাবরই তাকে দ্রুত সুযোগ দেয়ার পক্ষে বলে গেছেন। সুযোগ পাওয়ার পর প্রথম ইনিংসে ১০ বলে ২ ছক্কায় ১৪ রান করেছেন সূর্যবংশী। অফ স্পিনার উইল জ্যাকসের অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বলে কাট করতে গিয়ে স্টাম্পড হয়েছেন বৈভব। তার আউট হওয়ার ধরনে খুব অবাক গাভাস্কার, ‘এটা কোনোভাবেই তার শট নয়। তার শট হলো কাভার ড্রাইভ।’

খেলা শুরুর আগে গাভাস্কার বলেছিলেন, ‘আমি অবাক হব না যদি সে প্রথম বল থেকেই মারমুখী হয়ে খেলতে শুরু করে। ভারতের যারা খেলা দেখছেন তারা সবাই আনন্দে লাফিয়ে উঠবেন। তারা সবাই উল্লসিত হবেন কারণ সে এখন ভারতের আদরের সন্তান। আর সবাই চায় তাদের সন্তান ভালো করুক।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights