​খামারে উৎসুক জনতার ঢল, সোয়া চার লাখ পশু প্রস্তুত, সরাসরি বিক্রির আশা খামারিদের

আব্দুস সালাম,​ দিনাজপুর প্রতিনিধি:

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দিনাজপুরের পশুর হাট ও খামারগুলোতে উৎসবের আমেজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই জেলার তিন উপজেলায় সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা বিশালাকৃতির তিনটি ষাঁড় পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৭ থেকে ৩০ মণ ওজনের এই বিশালদেহী ষাঁড়গুলোকে দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে উৎসুক মানুষ খামারে ভিড় জমাচ্ছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এড়াতে খামারিরা হাটে না নিয়ে সরাসরি খামার বা বাড়ি থেকেই এগুলো বিক্রির আশা করছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, এবার দিনাজপুর জেলায় কোরবানি উপলক্ষে প্রায় সোয়া চার লাখের বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।
​পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যদুর্গাপুর গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক কোরবানি উপলক্ষে প্রস্তুত করেছেন জেলার সবচেয়ে বড় ষাঁড়, যার নাম রাখা হয়েছে ‘সম্রাট’। শাহীওয়াল-ফ্রিজিয়ান ক্রস জাতের, ধূসর রঙের এই শান্ত ষাঁড়টির ওজন প্রায় ৩০ মণ (১,১২৫ কেজি)। দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ফুট এবং উচ্চতা ৫ ফুট। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ও পরম যত্নে বড় করা ‘সম্রাট’-কে দেখতে প্রতিদিন আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে মানুষের মেলা বসছে।
​খামারি রাজ্জাক জানান, বিশাল ওজনের কারণে হাটে আনা-নেওয়া করা অত্যন্ত কষ্টকর। তাই বাড়ি থেকেই ১২ লাখ টাকায় তিনি ষাঁড়টি বিক্রি করতে চান। পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানের মতো স্নেহ দিয়ে বড় করা সম্রাটকে নাম ধরে ডাকলেই সে সাড়া দেয়। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম জানান, খামারি যাতে পশুর ন্যায্যমূল্য পান, সেজন্য প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
​এদিকে বিরল উপজেলার ছেতরাবাজারের ‘ইসলাম অ্যাগ্রো খামার’-এ প্রস্তুত করা হয়েছে ২৫ মণ ওজনের ব্রাহমা ক্রস জাতের শান্ত স্বভাবের এক ষাঁড়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘রংবাজ’। এই বিশালদেহী পশুটির দাম হাঁকানো হয়েছে ৯ লাখ টাকা। খামারের তত্ত্বাবধায়ক মো. মইনুল ইসলাম দাবি করেন, ষাঁড়টির পেছনে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হয়। সম্পূর্ণ রোগমুক্ত ও সুঠাম দেহের এই ষাঁড়টি দেখতে খামারে প্রতিদিন মানুষ ভিড় করছেন। খামারির আশা, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি খামার থেকেই এটি বিক্রি হবে। বিরল উপজেলা উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. ইস্রাফিল হোসেন জানান, ব্রাহমা ক্রস জাতের এত বড় গরু লালন-পালন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হলেও কোরবানির হাটে এটি ভালো দাম পাবে।
​বীরগঞ্জ উপজেলার মুরারিপুর কাচারিপাড়া গ্রামের খামারি মো. মনিরুল ইসলামের সাড়ে ১৭ মণ (৭০০ কেজি) ওজনের ষাঁড় ‘বাদশা’ এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সুষম খাদ্য খাইয়ে বড় করা এই ষাঁড়টির দাম ধরা হয়েছে ৫ লাখ টাকা। স্থানীয় শিবরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সত্যজিৎ রায় কার্তিক বলেন, ‘বাদশা’ এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করায় স্থানীয় অন্য খামারিরাও দারুণভাবে উৎসাহিত হচ্ছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শাহরিয়ার মান্নান জানান, খামারিরা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণে এগিয়ে আসায় তা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
​জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার দিনাজপুরের ৬২ হাজার ৪০৮ জন খামারি ও সাধারণ গৃহস্থের ঘরে কোরবানির জন্য মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৪টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: গরু: ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৬টি, ​ছাগল: ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৯০টি, ​ভেড়া: ১৩ হাজার ৭২৯টি, ​মহিষ: ২৪৮টি, দুম্বা: ১১টি।
​প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা আশা করছেন, দেশীয় খামারিদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এবার জেলায় পশুর কোনো ঘাটতি হবে না এবং খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights