খোলা যানবাহনে বর্জ্য পরিবহন

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য খোলা ট্রাক-টমটম-ভ্যানে তোলা হয়। এরপর উপচে পড়া দুর্গন্ধযুক্ত, দূষিত বর্জ্য নিয়ে শহরের ভিতর দিয়ে চলে যানবাহনগুলো। যানবাহনে ঢাকনা না থাকায় ডাম্পিং স্টেশনে যাওয়ার পথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায় পড়ে এসব বর্জ্য। দূষিত করে পরিবেশ।

এভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অসংখ্য উন্মুক্ত যানবাহন বর্জ্য পরিবহন করে। ঢাকনা না থাকায় ময়লায় পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। চলন্ত বর্জ্য নগরকে দূষিত করছে। ধারণক্ষমতার বেশি বর্জ্য নিয়ে ছুটে চলা গাড়িগুলো থেকে বর্জ্য পড়ছে সড়কেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রোগব্যাধির একটি প্রধান কারণ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছড়িয়ে পড়া বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু বাতাসে মিশে যায়। বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। দূষিত পরিবেশ ও পানির মাধ্যমে সহজেই ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়ায়। বাতাসে ভাসমান জীবাণু ও ধূলিকণা ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়, শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। ময়লা ও দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগ বৃদ্ধি পায়। মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। জমে থাকা বর্জ্যে পানি জমে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়ে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ বেশি ঝুঁুঁকিতে রয়েছেন।

দুর্গন্ধযুক্তচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান বলেন, নগর জীবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিবহনের সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে যেতে রাস্তাজুড়ে আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ার যে চিত্র আমরা প্রায়ই দেখি, তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি। তাই এখন জরুরি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তি-এই তিনটি ধাপ সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু আমাদের শহরগুলোতে পরিবহনের ধাপেই বড় ধরনের ত্রুটি দেখা যায়। অপরিকল্পিত রুট, অনিয়মিত সময়সূচি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে বর্জ্য পরিবহনের সময় তা ছড়িয়ে পড়ে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা জরুরি।

চসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা বলেন, কিছু খোলা টমটম ও ভ্যানে করে ওয়ার্ড পর্যায় থেকে এখনো বর্জ্য পরিবহন করা হয়। তবে আমাদের পরিকল্পনা আছে সব যানবাহন বক্স আকারে করার। আস্তে আস্তে সব বর্জ্য পরিবহন বক্স আকারে হয়ে যাবে।

জানা যায়, চসিকের ৪১টি ওয়ার্ডে অপসারণের সুবিধায় ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। বর্জ্য পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হয় ১২০টি বড় গাড়ি, ৫৫টি টমটম ও ৫০০টি ভ্যান। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ৩ হাজার ৫৫৮ জন শ্রমিক। এর মধ্যে ৮৩৬ জন অস্থায়ী। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্যগুলো বাসা এবং ডাস্টবিন থেকে ভ্যান গাড়িতে করে সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে ফেলে। এরপর সেখান থেকে বড় ট্রাকে করে নগরের দক্ষিণ দিকের আবর্জনাগুলো ফেলা হয় হালিশহরের সমুদ্র উপকূলের আনন্দবাজার এলাকায়। ১০ একরের বেশি এই জায়গায় প্রতিদিন ফেলা হয় প্রায় দেড় হাজার টন বর্জ্য। অপর বর্জ্যাগার বায়েজিদ আরেফিন নগরেও ফেলা হয় প্রায় দেড় হাজার টন বর্জ্য। নগরের দুই প্রান্তে অবস্থিত প্রধান বর্জ্যাগারে নেওয়ার সময় খোলা ট্রাকে নেওয়া হয়। ফলে বর্জ্যগুলো নানাভাবে সড়কে পড়ে পরিবেশ নষ্ট করে। বিশেষ করে খোলা ট্রাকে করে নেওয়ার সময় দোকান-মার্কেটের সামনে ময়লা-আবর্জনা পড়ার কারণে সমস্যা তৈরি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights