গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাংলাদেশ

দীর্ঘ প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে প্রত্যাবর্তন নিছক একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকারহীনতা, একদলীয় কর্তৃত্ববাদ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের যে অচলাবস্থা দেশকে গ্রাস করেছে; পতিত স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন জনগণের মধ্যে নতুন আশা, সাহস ও প্রত্যয়ের সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ আজ গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। পতিত স্বৈরাচার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে, নির্বাচনব্যবস্থায় জনগণ আস্থা হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী, সংগঠিত ও আপসহীন নেতৃত্ব ছাড়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও সঠিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব নয়। তারেক রহমান সেই নেতৃত্বের প্রতীক : যিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের মূলশক্তি তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। অতীতে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বিএনপি দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সুসংগঠিত হয়েছে এবং ২৪-এর গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রবাসে থেকেও তিনি দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে দূরত্ব তাঁর নেতৃত্বকে দুর্বল করতে পারেনি। বরং প্রতিকূলতা তাঁকে আরো দৃঢ় ও আপসহীন করে তুলেছে। তাঁর দেশে প্রত্যাবর্তন বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিকে বহুগুণে বাড়াবে এবং আন্দোলন-সংগ্রামে নতুন গতি সঞ্চার করবে। এই প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য শুদু বিএনপির জন্য নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি শক্তিশালী বিএনপি মানেই একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক শক্তি। তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি আগামীর বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে দৃশ্যমান রূপ দেবে। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তরুণদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সংযোগ, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট ধারণা এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রতি তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার সর্বোপরি ঘোষিত ৩১ দফা বিএনপিকে একটি আধুনিক, গণমুখী ও ভবিষ্যত্মুখী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এ সময় একটি মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না।

তারেক রহমানের মাতা, দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। এমন সংকটময় সময়ে পুত্র হিসেবে তাঁর মায়ের পাশে থাকা যেমন নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতায় আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া একটি ঐতিহাসিক কর্তব্য। এই দুই দায়িত্বই তাঁর নেতৃত্বের মানবিকতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। অবশ্যই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। তবে বিএনপির রাজনীতি প্রতিহিংসার নয়, প্রতিরোধের; সহিংসতার নয়, সংগ্রামের; ক্ষমতার নয়, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করেই বিএনপি তার আন্দোলনকে এগিয়ে নেবে—এই প্রত্যাশাই জনগণের। সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের স্বদেশে প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই আগমন বিএনপিকে আরো শক্তিশালী করবে, জনগণের সংগ্রামকে সুসংগঠিত করবে এবং বাংলাদেশকে আবারও গণতন্ত্রের পথে ফেরাতে সহায়ক হবে, এই বিশ্বাস দৃঢ় ও যৌক্তিক। এখন সময় সাহসী নেতৃত্ব, আপসহীন রাজনীতি এবং জনগণের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার। সেই পথেই যদি এই প্রত্যাবর্তন পরিচালিত হয়, তবে ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। লেখক : প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights