গ্যারেজের চালে ঝুলছে মামলার আলামত

মানিক মুনতাসির

খুনের মামলার রক্তমাখা জামাকাপড়, হত্যায় ব্যবহৃত চাকু-ছুরি, ভুক্তভোগীর জুতা-স্যান্ডেল কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত থাকার কথা নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন থানায় এসব স্পর্শকাতর আলামতই রাখা হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। কোনোটি পলিথিনের ব্যাগে, কোনোটি সাদা প্লাস্টিকের কাগজের প্যাকেটে ভরে দড়ি, তার কিংবা খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও টিনের চালা থাকলেও চারপাশ খোলা। আবার এসব স্থানে অবাধে যাতায়াত করছেন থানায় আগত ব্যক্তিরা। ফলে রোদ-বৃষ্টি, ধুলাবালি ও আর্দ্রতার মধ্যে দিনের পর দিন পড়ে থেকে এসব আলামত নষ্ট হলে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর খিলগাঁও থানায় এমন দৃশ্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। থানার ভিতরের একটি অংশে কয়েক শ সাদা কাগজের ব্যাগে বিভিন্ন মামলার আলামত ঝুলতে দেখা গেছে। সারি সারি প্যাকেট দড়ি ও তারের সঙ্গে ঝোলানো। কোনো কোনো প্যাকেটের বাইরে মামলার নম্বর, জব্দ তালিকার নম্বর কিংবা ভিতরে থাকা আলামতের পরিচয় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়। রাজধানীর আরও কয়েকটি থানায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। এভাবে খোলা আকাশের নিচে অযত্ন-অবহেলায় মামলার আলামত সংরক্ষণ করাকে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের প্রতি অবহেলা বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

খুনের মামলার আলামতও ঝুলছে : থানাগুলোতে ঝুলতে থাকা প্যাকেটের মধ্যে বিভিন্ন মামলার আলামত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রক্তমাখা পোশাক, চাকু-ছুরি, জুতা-স্যান্ডেল, সিগারেটের প্যাকেট এবং ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির মতো মামলার তদন্তে এসব বস্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একটি রক্তমাখা পোশাক কিংবা ব্যবহৃত কোনো বস্তু থেকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব আলামত পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা, আদালতে উপস্থাপন অথবা পুনঃতদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। সে কারণে তদন্তের কোনো পর্যায়েই আলামতের নিরাপদ সংরক্ষণকে উপেক্ষার সুযোগ নেই। কিন্তু থানার ভিতরে খোলা জায়গায় ঝুলিয়ে রাখার কারণে প্রশ্ন উঠেছে এসব আলামতের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়ে। অবশ্য কোনো কোনো থানায় নির্দিষ্ট জায়গায় ঘরের ভিতরে আলামত সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আলামতের ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রক্ত, শরীরের অন্যান্য জৈব উপাদান বা আর্দ্রতাসংবেদনশীল বস্তু অনুপযুক্ত পরিবেশে রাখলে সময়ের সঙ্গে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে। এতে পরবর্তী পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত তথ্য পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। খোলা জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা প্যাকেটের ক্ষেত্রে আরও একটি ঝুঁঁকি রয়েছে। বৃষ্টি বা অতিরিক্ত আর্দ্রতায় প্যাকেট ভিজে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের রোদে কাগজ ও পলিথিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধুলাবালি জমতে পারে। প্যাকেট ছিঁড়ে গেলে আলামত পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ ছাড়া যেভাবে আলামতগুলো অনিরাপদভাবে রাখা হয়েছে যে কোনো সময় সেগুলো চুরিও হয়ে যেতে পারে। মামলার আলামত হারিয়ে গেলে কিংবা নষ্ট হয়ে গেলে শুধু একটি বস্তুই হারায় না-হারিয়ে যেতে পারে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র। কোনো আলামত আদালতে উপস্থাপনের প্রয়োজন হলে কিংবা বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর সময় তা পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তাকেও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় খোলা জায়গায় এভাবে মামলার আলামত রাখার কারণ, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর সংরক্ষণব্যবস্থা এবং বিষয়টি নিয়ে পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ কী-এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, এভাবে সংরক্ষণ করার কথা নয়, যদি হয়ে থাকে সেটা অবহেলার প্রমাণ আমরা ব্যবস্থা নেব। তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ থানায় তো আলামত সংরক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে।

টিআইবির বক্তব্য : মামলার আলামত সংরক্ষণে অনিয়ম তদন্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তুলতে পারে। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের বলেন, যেকোনো স্পর্শকাতর ঘটনার তথ্য, প্রমাণাদি সংরক্ষণ করা উচিত খুবই সাবধানে এবং সঠিক নিয়মে। অন্যথায় আলামত চুরিও তো হয়ে যেতে পারে। ফলে মামলা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে করে পার পেয়ে যাতে পারে বড় বড় অপরাধীরা। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি থানায় মামলার আলামত সংরক্ষণের জন্য আলাদা নিরাপদ কক্ষ থাকা প্রয়োজন। আলামতের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত প্যাকেট বা পাত্র ব্যবহার, প্রতিটি প্যাকেটে মামলার নম্বর ও জব্দ তালিকার নম্বর উল্লেখ এবং সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা রাখা জরুরি।

একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। কারণ একটি মামলার তদন্ত শেষ হলেও আলামতের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। আদালতের নির্দেশে তা উপস্থাপন করা হতে পারে। পুনঃতদন্তে প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষজ্ঞ পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হতে পারে। বছরের পর বছর পরও কোনো মামলার আলামত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আলামত যদি থানার ভিতরেই দড়ি বা তারে ঝুলতে থাকে, তাহলে তার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত-এ প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি। কারণ বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি সেই প্রমাণ সংরক্ষণের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights