গ্রিসে এক টুকরা বাংলাদেশ

মতিউর রহমান মুন্না, গ্রিস থেকে

গ্রিসের রাজধানী এথেন্স। ঐতিহাসিক স্থাপনা, পর্যটকের ভিড় আর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের শহর। এ শহরের এক এলাকার নাম ওমোনিয়া। অনেক বছর ধরে এ ওমোনিয়া বাংলাদেশের প্রবাসী সমাজের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। কর্মসংস্থান, ব্যবসা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশ-সব মিলিয়ে ওমোনিয়া আজ যেন ইউরোপের বুকে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। ওমোনিয়ার সব সড়কেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বাংলাদেশিদের।

বিশেষ করে গেরানিও এবং আশপাশের সব সড়ক, যা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কারণে। গভীর রাত পর্যন্ত এখানে থাকে শত শত প্রবাসীর পদচারণ। দেশি পণ্য এবং কম দামে সব পাওয়া যায়।

গেরানিও সড়কে হাঁটলেই চোখে পড়ে ছোট ছোট চায়ের স্টল, সবজি-ফলমূলের দোকান, পানের স্টল, ঝালমুড়ি, চটপটি, ফুচকার দোকান। সবই যেন হুবহু বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের মতো। এ রোডকে কেউ বলেন ‘বাংলা গল্লি’, কেউ ‘কাইল্লার গল্লি’। আফ্রিকান আধিপত্য ‘কাইল্লার গল্লি’ থেকে ‘বাংলা গল্লি’ নামকরণ। একসময় এ এলাকায় আফ্রিকান অভিবাসীদের আধিপত্য ছিল। তখনই বাংলাদেশিরা মজার ছলে রাস্তাটিকে ডাকতে শুরু করেন, ‘কাইল্লার গল্লি’ বলে। মূলত ‘কাইল্লা’ শব্দটি দিয়ে আফ্রিকানদের বোঝানো হলেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা রাস্তাটি নিজেদের মতো করে চিহ্নিত করতে এ নাম ব্যবহার করতেন। পরে নামটি জনপ্রিয় হয়ে যায়। এখনো সবাই রাস্তাটিকে কাইল্লার গল্লি নামেই ডাকে। এমনও প্রবাসী আছেন যে সড়কের আসল নাম জানেন না, কিন্তু কাইল্লার গল্লি বললে ঠিকই চেনেন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে জনসংখ্যা ও ব্যবসায়িক কাঠামো বদলে গেছে। ফলে আজ পুরো এলাকাটিই বাংলাদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে কেউ কেউ আবার মমতার সঙ্গে একে বলেন ‘বাংলা গল্লি’।

গেরানিও সড়কে বাংলাদেশিদের ব্যবসা এখন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। কসমেটিকস, গ্রোসারি শপ, দেশি খাবারের রেস্টুরেন্ট, মিনি মার্কেট, মানি ট্রান্সফার এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্ট, সেলুন, মোবাইল, ইলেকট্রনিকস শপসহ সবই আছে। এখানকার দোকানগুলোতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের পণ্য, সবজি, মাছ, মাংস, দই-মিষ্টি, হাঁড়ি ভর্তি বিরিয়ানি, মসলাজাতীয় দ্রব্য, দেশি বস্ত্র থেকে শুরু করে ছোটখাটো হস্তশিল্প পর্যন্ত। নতুন প্রবাসীরা এখানে এলেই পেয়ে যান নিজের দেশের স্বাদ ও সহজে মানিয়ে নেওয়ার পরিবেশ। রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে সাঁটা বাংলা ভাষায় বিভিন্ন পোস্টার। দোকানের সাইনবোর্ডও বাংলায়। সব মিলিয়ে এলাকাটি এক টুকরো বাংলাদেশ।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এ সড়ক জমে ওঠে কথাবার্তা, আড্ডায়। হাতে গরম চায়ের কাপ, পাশে পরিচিত মুখ আর সামনে বাংলাদেশি খাবারের সুবাস। সব মিলিয়ে প্রবাসীরা এখানে একটু স্বস্তি খুঁজে পান, খুঁজে পান নিজ দেশের অনুভূতি। তারা রাজনীতি থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, পরিবার, কাজের অভিজ্ঞতা, নতুন স্বপ্ন কিংবা অতীতের কষ্ট সবকিছুই অবলীলায় ভাগাভাগি করেন এখানে জমে ওঠা সঙ্গীদের সঙ্গে। এ আড্ডা যেন তাদের জন্য অনানুষ্ঠানিক থেরাপির জায়গা, যেখানে মন খুলে কথা বললে অনেকটাই হালকা হওয়া যায়।

ওমোনিয়া ঘিরে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি সমাজ শুধু ব্যবসাকেন্দ্রিকই নয়; এটি অনেকটা কমিউনিটি সাপোর্ট সিস্টেমের মতো। নতুন প্রবাসীরা বাসা, কাজ, ডকুমেন্টেশনসহ নানান বিষয়ে এখানে এসে পরামর্শ পান। কেউ সমস্যায় পড়লে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও আছে প্রবাসীদের। একদিকে ব্যবসায়িক সংহতি, অন্যদিকে সামাজিক সহমর্মিতা, সব মিলিয়ে এ এলাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাই ওমোনিয়া শুধু একটি এলাকা নয়; প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এটি গ্রিসের বুকে জীবন্ত এক টুকরো বাংলাদেশ। এখানে এসে তারা মনে করেন, ‘দেশ থেকে অনেক দূরে থাকলেও বাংলাদেশ দূরে নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights