চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে গুলিস্তান

রফিকুল ইসলাম রনি ও হাসান ইমন

রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান। দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ব্যস্ততম পরিবহন হাব। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এলাকাটি এখন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। ফুটপাত থেকে শুরু করে মূল রাস্তার সিংহভাগ এখন আর পথচারী বা যানবাহনের নেই, তা চলে গেছে শক্তিশালী চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের কবজায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও গুলিস্তানের ফুটপাতে চাঁদাবাজির কাঠামো বদলায়নি। জাতীয়তাবাদী হকার্স দলের কয়েকজনকে সামনে এনে পুরোনো ও চিহ্নিত লাইনম্যানরাই এখন নতুন মোড়কে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। হোতা হিসেবে উঠে এসেছে নবী, বাবুল, হারুন, সালেহসহ অন্তত ২০ জনের নাম। লাইনম্যানখ্যাত এ চক্রটি পুরো গুলিস্তানের নিয়ন্ত্রক। তবে হকারদের শৃঙ্খলার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন। সংস্থা দুটি খালি জায়গা, ফুটপাত ও রাস্তার এক পাশে আইডি কার্ড দিয়ে হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও গত মাসের শুরুতে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটসহ বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই আবার পুরোনো রূপ ফিরে আসে।

পজিশন বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা : গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে জিপিও, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এবং গোলাপশাহ মাজার এলাকায় নতুন কোনো হকার বসতে চাইলে তাঁকে প্রথমে দিতে হয় মোটা অঙ্কের ‘পজিশন ফি’। এলাকাভেদে এর পরিমাণ ২ থেকে ৫ লাখ টাকা। একজন হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখানে শুধু বসার অনুমতি পেতেই কয়েক লাখ টাকা লাইনম্যানদের হাতে দিতে হয়। এ টাকা না দিলে ফুটপাতে বসা দূরের কথা, দাঁড়ানোও সম্ভব নয়। শুধু পজিশন ফি দিয়েই শেষ নয়; এরপর পদে পদে দিতে হয় টাকা। গুলিস্তানে চাঁদাবাজির তিনটি স্তর রয়েছে। প্রথমত প্রতিটি দোকান বা ভ্যান থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। দোকানের আকার এবং অবস্থানের গুরুত্ব অনুযায়ী এ হার নির্ধারিত হয়। এরপর প্রতিটি ‘বিট’ বা নির্দিষ্ট সীমানার জন্য হকারদের গুনতে হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া। বিশেষ বিশেষ দিনে বা উৎসবের আগে লাইনম্যানদের আলাদা নজরানা দিতে হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, গুলিস্তান এলাকার হাজার হাজার হকার থেকে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়।

লাইনম্যানের রাজত্ব : লাইনম্যান নবী রাজধানী হোটেল ও বেল্টের গলি নিয়ন্ত্রণ করেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি বিএনপি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নবী গুলিস্তান এলাকার প্রভাবশালী লাইনম্যান। গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনের ফুটপাত ও রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করছেন হারুন। আহাদ পুলিশবক্স থেকে সিনেমা হল পর্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। এ ছাড়া গুলিস্তান বিল্ডিং থেকে ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত রজ্জব, লম্বা বাবুল, সেলিম, বিমল, বাচ্চু, খোরশেদ, নিপু, মোহাম্মদ আলী। ওসমানী উদ্যান পূর্ব এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন শাহজাহান। খদ্দর মার্কেটের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন কাদির। স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেট নিয়ন্ত্রণ করেন খলিল ও পুটন। জাসদ অফিসের সামনের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন রহিম। কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের সামনের এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন কালা নুরু। বেল্টের গলি থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছেন আকতার ও জাহাঙ্গীর। জিপিও এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন সালাম। ফুলবাড়িয়া ও বাস টার্মিনাল এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আলী। রমনা ভবন ও ভাসানী স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন আলী মিয়া। এই লাইনম্যানরা প্রতিদিন বিকালে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর নিযুক্ত প্রতিনিধি হকারদের কাছ থেকে টাকা উঠিয়ে তাঁর কাছে জমা দেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা দেরি করলে তাঁকে তাৎক্ষণিক উচ্ছেদ করা হয়, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হয়।

লাইনম্যানদের পেছনে হকার্স সংগঠন : লাইনম্যান সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিভিন্ন হকার্স সংগঠন। এর মধ্যে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের নেতৃত্বে রয়েছেন আবুল হাসেম কবির ও হযরত আলী। হকার্স সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন আবুল হোসেন ও হারুনুর রশীদ। ছিন্নমূল হকার্স সমিতির দায়িত্বে রয়েছেন কামাল উদ্দিন ছিদ্দিক ও জুয়েল। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, ‘রাজধানীতে হকারদের শৃঙ্খলায় নিয়ে আসতে হলে সর্বপ্রথম লাইনম্যানখ্যাত চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এরপর হকারদের তালিকা করতে হবে। যদিও হকারদের তালিকা সিটি করপোরেশনের কাছে রয়েছে। এসব হকারকে আইডি কার্ড দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হবে। তবে এর আগে অবশ্যই নীতিমালা করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এবং সরকার চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। যাঁরা হকার তাঁদের নির্ধারিত জায়গায় বসার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্ডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কার্ডধারীরা বৈধ, তাঁদের কাছ থেকে কেউ চাঁদা চাইতেও পারবে না, তাঁরা চাঁদাও দেবেন না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights