‘চায়নাম্যান থেকে আর্মসম্যান’ ইমন

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের। অস্ট্রেলিয়ার বাঁ-হাতি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারকে ভালোবেসে নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন ডেভিড। জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এসে ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট ক্লাব চট্টগ্রাম ব্রাদার্স ইউনিয়ন একাডেমিতে শুরু করেন অনুশীলন। ‘চায়নাম্যান’ (বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার) হওয়ায় চট্টগ্রামে আসা বিদেশি ক্রিকেট দলগুলোর অনুশীলনে ডাক পড়ত তার। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শহরে এলেও তিনি হয়ে গেলেন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাস ‘ডেভিড ইমন’। তার ব্যাপারে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। সাজ্জাদ দেশের বাইরে পলাতক থাকায় তার বাহিনীর লিডার বলা যায় তাকে। তার বিরুদ্ধে ৭ হত্যাসহ ১৩ মামলা রয়েছে। ডেভিড ইমন গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাহিনীর বাকি সদস্যদের দিকে নজর রয়েছে আমাদের। তাদেরও গ্রেপ্তারের আওতায় আনা হবে।’ ডেভিড ইমনের ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চট্টগ্রাম ব্রাদার্স ইউনিয়নের কোচ ও ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত মুখ মাসুম উদ দৌলা বলেন, ‘ডেভিড ইমন সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডার ছিলেন। চায়নাম্যান হওয়ায় চট্টগ্রামে সফরে আসা দেশিবিদেশি দলগুলোর নেট বোলার হিসেবে একসময় ডাক পড়ত তার। ২০১৭ সাল থেকে করোনার আগ পর্যন্ত অনুশীলনে নিয়মিত ছিলেন। এরপর ক্রিকেট থেকে হারিয়ে যান।’ অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৭ সালের দিকে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামে ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে যোগ দেন। ছিলেন একজন বাঁ-হাতি চায়নাম্যান। জাতীয় কিংবা বিদেশি দলগুলো চট্টগ্রামে এলে তিনি নেট বোলার হিসেবে বল করতেন। ২০২০ সালের পর হঠাৎ করেই ইমন ক্রিকেট-জগৎ থেকে উধাও হয়ে যান। করোনা মহামারির পর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তার নাম আসতে শুরু করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ইমন আত্মগোপনে গিয়ে বায়েজীদ বোস্তামী এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ‘ছোট সাজ্জাদ’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন। পরে বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী ওরফে শিবির সাজ্জাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। দ্রুতই এই অপরাধ সিন্ডিকেটের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তারা আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে ভয়ংকর ‘থ্রি-টায়ার’ বা তিন স্তরের অপরাধ কাঠামো গড়ে তোলেন। বিদেশে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ গডফাদার ‘শিবির সাজ্জাদ’ ইন্টারনেট কলিং অ্যাপ বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে চাঁদা দাবি এবং হামলার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন। দ্বিতীয় স্তরে আছেন ডেভিড ইমনের মতো সন্ত্রাসীরা। তারা সমাজের পেশাজীবী বা ব্যবসায়ী ইনফরমারদের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ব্যাংক বা পরিবারের নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে গডফাদারদের কাছে পাঠান। তৃতীয় স্তরে রয়েছে স্থানীয় কিশোর গ্যাং বা ভাসমান অপরাধীদের নিয়ে গঠিত হিট স্কোয়াড। তারা মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ফাঁকা গুলি বা ভাঙচুর চালিয়ে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার জোড়া খুনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন। এরপর একে একে শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলা, ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ ৭ হত্যায় তার নাম উঠে আসে। তার বিরুদ্ধে নগরী এবং জেলার বিভিন্ন থানায় ১৩ মামলা রয়েছে। পুলিশের দাবি, ইমনের কাছে ১৫ থেকে ২০টি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র আছে। তিনি অস্ত্র ব্যবহারে বিশেষভাবে দক্ষ।

এদিকে ডেভিড ইমনকে গতকাল চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা আফরিনের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। এর আগে যশোরে আটক ডেভিড ইমনকে তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আগামী সপ্তাহে তার রিমান্ড শুনানি হতে পারে। সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, ডেভিড ইমনকে তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আগামী সপ্তাহে তার রিমান্ড শুনানি হতে পারে। ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান জানান, ডেভিড ইমনকে একটি হত্যা এবং দুটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights