চার ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে গিয়ে ক্লান্ত ইসরায়েল, বিজয় এখন দূরাশা: বিশ্লেষণ
অনলাইন ডেস্ক
ইসরায়েল বর্তমানে গাজা, লেবানন, ইরান এবং ইয়েমেন; এই চারটি ভিন্ন ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাতের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে ইসরায়েল এখন সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর রণকৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বা ‘নকআউট’ পরাজয়ের মুখোমুখি হয়নি।
সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে। ইসরায়েলি বিমান বাহিনী হাজার হাজার অভিযান পরিচালনা করে ইরানের সামরিক অবকাঠামো এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের সামরিক শিল্পকে দুর্বল করে দেওয়া যাতে তারা ভবিষ্যতে বড় কোনো হামলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের সংঘাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর অব্যাহত রকেট এবং ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননের ভেতরে স্থল অভিযান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও গত বছরের শেষ দিকে হিজবুল্লাহর শক্তি অনেকটা ক্ষয় হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি তাদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের রকেট হামলা ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের সীমাবদ্ধতাকেই সামনে এনেছে।
ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল ইয়াল জামির গত নভেম্বরে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তারা এখন আর রক্ষণাত্মক অবস্থানে নেই। সাতই অক্টোবরের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর ইসরায়েল এখন আক্রমণাত্মক আগাম হামলা (‘প্রি-এমপ্টিভ’) চালানোর নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো হুমকি ঘরের দোরগোড়ায় আসার আগেই শত্রু শিবিরে আঘাত হানা এবং লেবানন ও গাজার মতো কৌশলগত এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই নতুন রণকৌশল দ্রুত বিজয় এনে দিতে পারছে না। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের মতো সংক্ষিপ্ত এবং সিদ্ধান্তমূলক জয়ের দিন এখন আর নেই। বর্তমান যুদ্ধগুলো দীর্ঘমেয়াদী ম্যারাথনে পরিণত হয়েছে। গাজায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলার পরেও হামাস এখনো ভূখণ্ডের অর্ধেকের বেশি এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে, যদিও তাদের রকেট সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল দাবি করেছিল যে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে, কিন্তু মার্চ ২০২৬-এ এসেও দেখা যাচ্ছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি বিন্দুমাত্র কমেনি। ইয়েমেনের হুথিরাও লোহিত সাগরে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এটা প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদী আকাশপথের হামলা বা অবরোধ দিয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
ইসরায়েলের ভেতরে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সেনাপ্রধান জামির মনে করেন যে নিরাপত্তা ধারণা পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা সন্ত্রাসবাদের পরবর্তী হুমকি প্রতিরোধ করতে পারবেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোকে উপড়ে ফেলা এতটাই কঠিন যে, ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক ডকট্রিন আসলে কেবল শত্রুর সক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী যুদ্ধের প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে। ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানগুলো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হতে পারে। তবে বর্তমানে চারটি ফ্রন্টে একসাথে লড়তে গিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যে ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে কোনো চূড়ান্ত বিজয়ের সংকেত মিলছে না।
