চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন একজন ডেলিভারিম্যান
অনলাইন ডেস্ক
সারাদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে খাবার পৌঁছে দেন। ব্যস্ততার ফাঁকে কখনো রাস্তার পাশে, কখনো বিরতির মুহূর্তে কাগজের ছোট ছোট টুকরোয় লিখে রাখেন মনের কথা। সেই সাধারণ এক ডেলিভারিম্যানের কলমই এবার এনে দিল চীনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার।
৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিং জিতেছেন লু শুন সাহিত্য পুরস্কার। তাঁর কবিতা সংকলন ‘লো ফ্লাইট’-এর জন্য এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত লু শুনের নামে প্রবর্তিত এ পুরস্কারকে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ সাহিত্য স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ওয়াংয়ের জীবনটা কখনোই সহজ ছিল না। জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই কবি কিশোর বয়সেই পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। জীবিকার তাগিদে কখনো নির্মাণশ্রমিক, কখনো আবর্জনা সংগ্রহকারী, আবার কখনো রাস্তার পাশে পণ্য বিক্রেতা হিসেবে কাজ করেছেন। অবশেষে ২০১৯ সালে শুরু করেন খাবার সরবরাহের কাজ।
তবে জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। গত এক দশক ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে আসছেন। তাঁর লেখায় উঠে আসে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, ক্লান্তি, স্বপ্ন এবং না বলা গল্পগুলো।
২০২২ সালে তাঁর লেখা ‘ম্যান ইন আ হারি’ শিরোনামের একটি কবিতা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ভুল ঠিকানা দেওয়ার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক গ্রাহকের খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেটিই কবিতার অনুপ্রেরণা ছিল।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘লো ফ্লাইট’ গ্রন্থটি তৈরি হয়েছে প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি কর্মীর সাক্ষাৎকার ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। বইটির একটি বহুল আলোচিত পঙক্তি “কে বলে ডানা মেললেই উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও তো এক ধরনের ওড়া।”
পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে ওয়াং বলেন, খবরটি প্রকাশের আগ পর্যন্ত আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলাম। তবে এখন আমি স্বস্তি অনুভব করছি। তবে এই সম্মাননা তাঁর জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, আমার জীবিকা নির্বাহের জন্য এই কাজ করা জরুরি নয়, কিন্তু আমি কাজের পরিবেশটা উপভোগ করি। এটি আমাকে সক্রিয় রাখে। আমি সাধারণ জীবনই বেছে নিতে চাই।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘লো ফ্লাইট’-এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে ওয়াংয়ের কবিতা এবার চীনের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও।
ওয়াং জিবিংয়ের এই অর্জন শুধু একজন লেখকের সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, সাহিত্য কোনো বিশেষ শ্রেণির সম্পদ নয়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন পথ পেরিয়ে আসা মানুষও কলমের শক্তিতে ছুঁয়ে যেতে পারেন সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখর।
চীনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকে নতুন নতুন লেখকের আবির্ভাব ঘটছে। সাবেক পার্সেল ডেলিভারি কর্মী হু আনিয়ান, খনিশ্রমিক চেন নিয়ানশি এবং কৃষক-কবি ইউ শিউহুয়ার মতো লেখকেরা ইতোমধ্যেই পাঠকদের নজর কেড়েছেন। তাদের লেখায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনসংগ্রাম।
ওয়াং জিবিংয়ের গল্প তাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়- স্বপ্নের কোনো পেশা নেই, আর সাহিত্য কখনো পরিচয় দেখে না।
সূত্র : বিবিসি
